
দেশের বিশাল যুবশক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, দেশের জনসংখ্যার বড় অংশ যুবসমাজ। এই জনমিতিক লভ্যাংশকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের পক্ষে সাফল্য অর্জন সম্ভব।
জাতীয় যুব দিবস-২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যার কাঠামোতে সবচেয়ে বড় অংশ যুবসমাজ, যা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ হিসেবে পরিচিত। এটি দেশের জন্য বড় সম্পদ ও সুযোগ। এই বিশাল যুবশক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে নিঃসন্দেহে সাফল্য অর্জন সম্ভব।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ এখনো স্বল্পোন্নত দেশ। এলডিসি থেকে উত্তরণের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার প্রস্তুতির সময় আরও তিন বছর বাড়ানো হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে হবে, যাতে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ টিকে থাকতে পারে।
এ ক্ষেত্রে যুবসমাজ সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তরুণরাই ভবিষ্যতের প্রধান চালিকাশক্তি। ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্বও তাঁদের হাতে।
বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে যুবসমাজকে কর্মমুখী করার ওপর গুরুত্ব দেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, তরুণদের হাতে উৎপাদনের চালিকাশক্তি তুলে দিতে হবে। শুধু রাজনৈতিক বিপ্লব বা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটি দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়, পাশাপাশি দেশকে নির্মাণও করতে হয়।
যুব উন্নয়নে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিভিন্ন অবদান ও কার্যক্রমের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন তিনি।
দেশ ও যুবসমাজের উন্নয়নে বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে রাষ্ট্রপতি বলেন, যুবকদের সামনে নিয়ে আসতে হবে এবং দেশ গঠনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁদের প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় সব ক্ষেত্রে যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করতে হবে। উন্নয়ন এবং তরুণদের ভাগ্য পরিবর্তনের পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা রাখা যাবে না।
নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রশংসা করে তিনি বলেন, দেশের তরুণ-তরুণীরা স্বল্প পুঁজি নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছেন এবং নিজেদের পণ্য উৎপাদন করছেন। তাঁরা দেশের বাজারের পাশাপাশি রপ্তানির ক্ষেত্রেও সাফল্য অর্জন করছেন। তাঁদের কাজ দেখে তিনি আনন্দিত ও উৎসাহিত হয়েছেন।
বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের সাফল্যে মুগ্ধতার কথা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, একজন নারী উদ্যোক্তা দেশীয় খাবার ও মিষ্টি তৈরি করে উল্লেখযোগ্য আয় করছেন। নিজের পরিবারকে সহযোগিতার পাশাপাশি তাঁর পণ্য বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগও নিয়েছেন। এ ধরনের সাফল্য অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক।
যুবসমাজকে শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে স্বনির্ভর ও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি। উদ্যোক্তাদের সহযোগিতায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম রয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে ঋণ সহায়তার ব্যবস্থাও আছে। এসব উদ্যোগ আরও কার্যকর ও বিস্তৃত করতে হবে। প্রশিক্ষণ, ঋণ ও অন্যান্য সহায়তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় উপযুক্ত উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছানো গেলে বেকারত্ব কমানোর পাশাপাশি আত্মনির্ভরশীল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও সুযোগ পেলে একজন মানুষ নিজের অবস্থার পরিবর্তনের পাশাপাশি অন্যদের জন্যও সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেন। এ ধরনের সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোই বড় চ্যালেঞ্জ।
এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব হলো উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য ন্যূনতম মূলধনের ব্যবস্থা করা। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের যথাযথ সহযোগিতা করা গেলে তাঁরাই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবেন বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি।
যুবসমাজকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তরুণদের মাদকাসক্তি থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, বর্তমানে যুবসমাজের বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো মাদকাসক্তি। তরুণদের মধ্যে মাদকের আসক্তি যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তা অত্যন্ত ভয়াবহ। এ আসক্তি বন্ধে সচেতনতা সৃষ্টি, প্রচারণা এবং কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌতুক ও বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যসহ সামাজিক অনিয়মের বিরুদ্ধে যুবসমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। রাষ্ট্রপতি বলেন, এসব সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুবসমাজের আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। নিজেদের উদ্যোগে প্রতিটি অঞ্চলে সংগঠন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম গড়ে তুলতে হবে, যাতে সমাজের জন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করা যায়।
দেশে বায়োগ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, বায়োগ্যাস প্রকল্পের ধারণাটি পুরোনো হলেও এটি অত্যন্ত কার্যকর ও উপযোগী। বর্তমানে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে বায়োগ্যাসের ব্যবহার বাড়ানো গেলে চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করা সম্ভব। এ ধরনের পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রকল্প সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে।
জাতীয় যুব পুরস্কারপ্রাপ্তদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁদের অর্জন ও সাফল্য দেশের অন্য তরুণ-তরুণী ও যুবকদের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
বক্তব্য শেষে রাষ্ট্রপতি জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী চাকরিমেলা এবং দেশব্যাপী স্থাপিত বায়োগ্যাস প্ল্যান্টগুলোর উদ্বোধন ঘোষণা করেন। এর আগে তিনি জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ে যুব পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেন।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. আবুল খায়ের ভূঁইয়া এবং মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মাহফুজুল আলম খান।
অনুষ্ঠানে যুব কার্যক্রমের ওপর নির্মিত একটি ভিডিও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এর আগে রাষ্ট্রপতি অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে বিভিন্ন স্টল ও যুবমেলা পরিদর্শন করেন।