
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলায় বৈশ্বিক নিঃসরণ দ্রুত কমানো এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি মোকাবিলায় বৈশ্বিক নিঃসরণ দ্রুত কমানো এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, সমুদ্রের উচ্চতা যত দ্রুত বাড়ছে, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বিশ্বকে তার চেয়েও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় আজ সকালে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কনফারেন্স রুম-৪-এ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত অস্তিত্বের সংকট মোকাবিলায় আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বক্তব্য দেওয়ার সময় এ আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ভয়াবহ পরিণতি বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একার পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এ সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহায়তা ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বিশ্ব যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করে, সাগর তার প্রতিটি টনের প্রতিক্রিয়া দেখায়। তাই শুধু অভিযোজনমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে এর প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ একটি সক্রিয় বদ্বীপ। দেশের ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে শত শত নদী প্রবাহিত হয়ে সাগরে গিয়ে মিশেছে। ফলে বাংলাদেশের মানুষের জীবন, সমৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ উপকূলীয় অঞ্চলের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২৫ সেন্টিমিটার বাড়লে বাংলাদেশের প্রায় ৪ শতাংশ ভূমি পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। এতে প্রায় এক কোটি মানুষের বসতবাড়ি, জীবিকা ও মানবিক মর্যাদা হুমকির মুখে পড়বে।
সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতি ঠেকাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এর অংশ হিসেবে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার এবং উপকূল সুরক্ষায় বিনিয়োগ করা হয়েছে।
জলবায়ু সহনশীলতা আরও বাড়াতে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, পানি সংরক্ষণ ও মজুতের জন্য পদ্মা ব্যারাজ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া, মাস্টার প্ল্যানের মাধ্যমে তিস্তা ব্যারাজ আধুনিকায়ন এবং ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ সবুজ প্রবৃদ্ধির পথেও এগিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে সৌরবিদ্যুতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে সবুজ শিল্প ও পরিবেশবান্ধব পরিবহনের প্রসার, জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলা এবং বন, জলাভূমি ও ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় প্রতিবেশব্যবস্থার সুরক্ষা জোরদারে কাজ চলছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সংকট মোকাবিলায় চারটি জরুরি পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন তিনি।
প্রথমত, বৈশ্বিক নিঃসরণ আরও দ্রুত, ব্যাপক ও ন্যায়সংগতভাবে কমিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার লক্ষ্য অর্জনে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
দ্বিতীয়ত, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন কার্যক্রমের জন্য পূর্বানুমেয় ও সহজলভ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তৃতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তি, তথ্য-উপাত্ত ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার বাড়ানোর আহ্বান জানান।
চতুর্থত, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার কথা বলেন তিনি। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন ও জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমুদ্র দ্রুত উচ্চতর হচ্ছে। তাই বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেও তার চেয়ে দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। ভবিষ্যৎ এবং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে এসে ঘোষণাপত্রে দেওয়া অঙ্গীকারগুলো বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেবে। একই সঙ্গে কোনো দেশকে যেন একা ‘রাইজিং টাইড’-এর মুখোমুখি হতে না হয়, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠক আয়োজন এবং ঘোষণাপত্র প্রণয়নে সহায়তা ও প্রচেষ্টার জন্য সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে আয়োজিত এ উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।