
দেশের অনাবিষ্কৃত পর্যটন সম্ভাবনাকে বাজারযোগ্য পণ্যে রূপান্তর, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং জাতীয় অর্থনীতিতে পর্যটনের অবদান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ করছে বাংলাদেশ। বিশ্ব পর্যটন দিবস সামনে রেখে এ উদ্যোগের পাশাপাশি ডিজিটালাইজেশন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব ও গন্তব্য উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে দেশের পর্যটন খাতকে নতুন কাঠামোয় এগিয়ে নিতে একটি উচ্চাভিলাষী রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করছে সরকার। অবসর বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে পর্যটনকে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ উন্নয়ন ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতে রূপান্তরের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হচ্ছে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা। এতে দেশের ১ হাজার ৪৯৮টি চিহ্নিত পর্যটন আকর্ষণকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এসব আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে সমুদ্রসৈকত, বন, পাহাড়, জলাভূমি, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা, গ্রাম, খাবার ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সরকার এসব সম্ভাবনাকে পরিকল্পিত, টেকসই ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক পর্যটন শিল্পে রূপ দিতে চায়।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বাসসকে বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা পর্যটন সম্ভাবনাগুলোকে একটি পরিকল্পিত ও টেকসই শিল্পে রূপান্তরের লক্ষ্যেই মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলেরই নিজস্ব পর্যটন গল্প রয়েছে। এর মধ্যে সুন্দরবন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ও হ্রদ, সিলেটের চা-বাগান, নদী ও জলাভূমি, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং মানুষের আতিথেয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
সরকার কক্সবাজারকে একটি আঞ্চলিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি পর্যটন খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থনীতির বহুমুখীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক উন্নয়নের বৃহত্তর কর্মসূচির অংশ হিসেবেও পর্যটনকে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, লক্ষ্যগুলো উচ্চাভিলাষী হলেও সরকার, বেসরকারি খাত ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী সমন্বিতভাবে কাজ করলে তা অর্জন করা সম্ভব।
রূপান্তরে তথ্য ও ডিজিটালাইজেশন গুরুত্বপূর্ণ
পর্যটন খাতের পরিকল্পিত উন্নয়নে নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার ও ডিজিটালাইজেশনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনসচিব ফাহমিদা আখতার বলেন, পর্যটনসংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য ডাটাবেস তৈরি এবং ডিজিটালাইজেশন ত্বরান্বিত করা তথ্যভিত্তিক নীতি ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যটন অর্থনীতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত তথ্যের ঘাটতি দূর করতে মন্ত্রণালয় ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট (টিএসএ) তৈরির কাজ শুরু করেছে। এর মাধ্যমে পর্যটনের কর্মসংস্থান, ভোগ, বিনিয়োগ এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ অবদান আরও সুশৃঙ্খলভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পর্যটন ব্যবস্থায়ও ডিজিটাল প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পর্যটকদের গন্তব্য সম্পর্কে তথ্য দেওয়া এবং পর্যটন-সংশ্লিষ্ট সেবা সহজলভ্য করতে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি গন্তব্যগুলোতে ডিজিটাল ব্যাখ্যা সুবিধা, রিয়েল-টাইম পর্যটন ড্যাশবোর্ড এবং পর্যটন বিপণন ও দর্শনার্থী সেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। :
১৯ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প পাইপলাইন
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. শামীমুজ্জামান জানান, চিহ্নিত পর্যটন সম্ভাবনার ভিত্তিতে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০টি উন্নয়ন প্রকল্প অগ্রাধিকার দিয়ে নির্বাচন করা হয়েছে। এসব প্রকল্প বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে জাতীয় অর্থনীতিতে পর্যটনের অবদান ৮ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। একই সঙ্গে বর্তমানে আনুমানিক ২৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এসব উদ্যোগের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও গতি আসতে পারে। প্রতিষ্ঠিত পর্যটন গন্তব্যের বাইরে পর্যটন থেকে অর্জিত আয় ছড়িয়ে দিয়ে স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও সক্রিয় করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিপিসি বর্তমানে সারাদেশে ৫৪টি সেবা ইউনিট পরিচালনা করছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির ন্যাশনাল হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ট্রেনিং ইনস্টিটিউট পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতে প্রায় ৫৪ হাজার মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। :
সরকার দেশের পর্যটন সম্ভাবনাকে আটটি পণ্য শ্রেণিতে ভাগ করেছে। এগুলো হলো—প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী; সমুদ্র ও নীল পর্যটন; পাহাড় ও অ্যাডভেঞ্চার; চা ও প্রকৃতিনির্ভর অবকাশ; ঐতিহ্য ও প্রত্নতত্ত্ব; নদী ও ক্রুজ পর্যটন; গ্রাম ও কমিউনিটি পর্যটন; এবং মাইস ও বিশেষ আগ্রহভিত্তিক পর্যটন।
বছর শেষে মহাপরিকল্পনা
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী জানিয়েছেন, বহুল প্রতীক্ষিত পর্যটন মহাপরিকল্পনাটি চলতি বছরের শেষ নাগাদ চূড়ান্ত হওয়ার আশা রয়েছে। পরিকল্পনাটিতে দেশের পর্যটন গন্তব্যগুলোর পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর পর্যটকদের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা ও সেবা নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। মহাপরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যটন খাতকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
২০১৯ সালে একটি কৌশলগত পর্যটন মহাপরিকল্পনা চালু করা হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, কোভিড-১৯ মহামারি এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে এর বাস্তবায়ন ও চূড়ান্ত অনুমোদন বিলম্বিত হয়। পরে পরিকল্পনাটি পর্যালোচনা ও সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠানো হয়। বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণকে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলছে।
পর্যটন গন্তব্যে সুযোগ-সুবিধা ও সেবা বাড়াতেও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ফারুকী। পাশাপাশি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রচারণা জোরদার করতে বিদেশি দূতাবাস, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান।
আকর্ষণকে অভিজ্ঞতায় রূপান্তর
বিপুল পর্যটন সম্পদ থাকা সত্ত্বেও এসব আকর্ষণকে বাণিজ্যিকভাবে দর্শনার্থীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা বাংলাদেশের পর্যটন খাতের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এ কারণে বর্তমান কৌশলে শুধু পর্যটন আকর্ষণ চিহ্নিত করার পরিবর্তে সেগুলোকে পূর্ণাঙ্গ পর্যটন অভিজ্ঞতায় রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ পর্যটনভিত্তি রয়েছে। দেশে প্রায় ৩ কোটি দেশীয় পর্যটক রয়েছে। একই সঙ্গে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে বাংলাদেশের সুযোগ রয়েছে। তবে দর্শনার্থীদের গড় অবস্থানের সময় প্রায় ২ দশমিক ৮ দিন।
পর্যটন খাত বিদেশি ও বেসরকারি বিনিয়োগ, নির্ভরযোগ্য তথ্য, সমন্বিত প্রকল্প এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ঘাটতির মুখোমুখি হচ্ছে। দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি অনেক পর্যটন গন্তব্যে আন্তর্জাতিক মানের শৌচাগার, পার্কিং, বহুভাষিক গাইড, জরুরি সেবা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবারও ঘাটতি রয়েছে।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সাবেক সভাপতি রাফেউজ্জামান বলেন, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনার পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক পর্যটকদের পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে সক্ষম গন্তব্য উন্নয়ন প্রয়োজন।
টোয়াবের সাবেক পরিচালক তাসলিম আমিন শোভন বিদেশি পর্যটকদের বাংলাদেশে আসা, বেশি সময় অবস্থান ও বেশি ব্যয় করার জন্য শক্তিশালী গন্তব্য ব্র্যান্ডিং, আন্তর্জাতিক বিপণন এবং পর্যটন পণ্য উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন।
ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ
উদীয়মান রোডম্যাপে ১৯টি অগ্রাধিকার সুপারিশ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে তিন বছরের মধ্যে সমন্বিত উন্নয়নের জন্য ১০টি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন আকর্ষণ নির্বাচন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব সম্প্রসারণ এবং ভিসা ও বিমানবন্দরে আগমনের প্রক্রিয়া সহজ করার প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া পর্যটন গন্তব্য খোঁজা, বুকিং, অর্থ পরিশোধ ও সেবা পর্যালোচনার জন্য একটি একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা, হোমস্টে ও কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটন উন্নয়ন, সুন্দরবনকেন্দ্রিক ইকো-ট্যুরিজম সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ ও কৃষিভিত্তিক পর্যটন বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। ঢাকার চারপাশে একটি সার্কুলার পর্যটন নৌপথ চালুর বিষয়ও রোডম্যাপে রাখা হয়েছে।
কৌশলটির আওতায় নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের পর্যটন অর্থায়ন ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো, প্রত্নতাত্ত্বিক আকর্ষণ সংরক্ষণ, ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট প্রতিষ্ঠা, রিয়েল-টাইম পর্যটন ড্যাশবোর্ড এবং আন্তর্জাতিক বিপণন জোরদারের প্রস্তাবও রয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী সরকার গন্তব্য পরিকল্পনা, সড়ক, ইউটিলিটি, স্যানিটেশন, নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ, ব্র্যান্ডিং, ভিসা সুবিধা, প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল অবকাঠামো ও সংরক্ষণে গুরুত্ব দেবে। অন্যদিকে বেসরকারি খাত হোটেল ও রিসোর্টে বিনিয়োগ, পর্যটন অভিজ্ঞতা, পরিবহন, ট্যুর পরিচালনা, ডিজিটাল বুকিং এবং সেবা উদ্ভাবনে ভূমিকা রাখবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী মহাপরিকল্পনা, পর্যটন খাতের নির্ভরযোগ্য তথ্য, ডিজিটালাইজেশন, বিনিয়োগ এবং গন্তব্য উন্নয়নের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের বৈচিত্র্যময় পর্যটন আকর্ষণগুলোকে আরও পরিকল্পিত, টেকসই ও অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর পর্যটন শিল্পে রূপ দেওয়ার ভিত্তি তৈরি করা হবে।