
আদেশ চাপিয়ে দেওয়ার প্রশাসনিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সেবামুখী, সমন্বিত ও মানবিক প্রশাসনের নতুন ধারা গড়ে তুলতে কাজ করছে গাজীপুর জেলা প্রশাসন বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি ভূমি সেবায় ‘জিরো টলারেন্স’, ভালো কাজ করা মানুষকে উৎসাহিত করা এবং পরিবেশ সুরক্ষায় হর্নমুক্ত গাজীপুর গড়ার মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া।
সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, একটি বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে নতুন সরকারের অধীনে দায়িত্ব পালন চ্যালেঞ্জিং। দায়িত্ব নেওয়ার সময় প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এবং মানুষের মনোজগতেও এক ধরনের অগোছালো পরিস্থিতি ছিল।
গত ১৬-১৭ বছরে প্রশাসন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, সিভিল প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ ও সেনাবাহিনী—সব প্রতিষ্ঠান সম্পর্কেই মানুষের মধ্যে আইন ও নিয়মনীতি যথাযথভাবে অনুসরণ না করার ধারণা তৈরি হয়েছিল। এর প্রভাবে আইন অমান্য করা কিংবা ‘মব’ তৈরি করে দাবি আদায়ের প্রবণতাও দেখা দেয়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে মানুষের চিন্তা ও মনোজগতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, আগের মতো শুধু ‘মারো, ধরো, কাটো’ বা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্রশাসন এখন নেই। জনগণের চাহিদা ও মনন বুঝে তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নতুন প্রশাসনিক ধারণা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ উদ্যোগে গাজীপুরের সর্বস্তরের মানুষের ব্যাপক সাড়া ও সহযোগিতা পাওয়া গেছে।
ভূমি সেবায় জিরো টলারেন্স
ভূমি অফিসে নাগরিক হয়রানি ও দুর্নীতির দীর্ঘদিনের অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ভূমি সেবার সঙ্গে মানুষের আবেগ, সম্পদ ও জীবিকা জড়িত। তাই দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি জানান, অবহেলা ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা বা তহশিলদারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অপরাধের ধরন বিবেচনায় পুরো অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি বা গণ-সাসপেন্ড করার মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
তবে শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, সেবার মান বাড়াতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনার ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি কমাতে অনলাইন পর্চা এবং অ্যাপের মাধ্যমে দেশের যেকোনো স্থান থেকে এমনকি ভ্রমণের সময়ও খাজনা দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক বলেন, শতভাগ সফল হওয়ার দাবি না করলেও উদ্যোগের ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি রাখা হচ্ছে না। অনেক সেবাগ্রহীতা ফোন করে জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দীর্ঘদিন আটকে থাকা কাজ কয়েক দিনের মধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে।
প্রশাসনিক কাজে গতিশীলতা
প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আনতে জেলা প্রশাসন কঠোর পরিশ্রম করছে জানিয়ে মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এবং ছুটির দিনেও কাজ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মেধাবী ও দক্ষ এবং সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজেদের সর্বোচ্চ সক্ষমতা কাজে লাগাতে প্রস্তুত।
পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ে তোলা ও ডেঙ্গু প্রতিরোধের অংশ হিসেবে গত দুই মাস ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শুক্র ও শনিবারও মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। সম্প্রতি একদিনে জেলার প্রায় ১ হাজার ৩০০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ৬০০টি স্থানীয় সরকার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়েছে।
‘ভালো কাজের ভালো মানুষ’ উদ্যোগ
অপরাধীদের দমনের পাশাপাশি সমাজে ভালো কাজ করা মানুষকে সামনে নিয়ে আসতে ‘ভালো কাজের ভালো মানুষ’ নামে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক।
তিনি বলেন, সমাজে সাধারণত চোর, ডাকাত বা অপরাধীদের চিহ্নিত করার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অথচ অনেক মানুষ নীরবে সমাজকে এগিয়ে নিতে কাজ করছেন। এসব ভালো মানুষকে সামনে নিয়ে এলে অপরাধপ্রবণতা কমার পাশাপাশি অন্যরাও ভালো কাজে উৎসাহিত হবে।
‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন’—এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখিত ‘প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্নেরও এটি একটি অংশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রকল্পটি নিয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছেন এবং ‘গাজীপুর মডেল’ হিসেবে এটি সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান জেলা প্রশাসক।
হর্নমুক্ত গাজীপুরে ১২ সপ্তাহের কর্মপরিকল্পনা
শিল্পনগরী গাজীপুরকে দূষণমুক্ত করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে হর্নমুক্ত জেলা গড়ার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক বলেন, গাজীপুরে শিল্প ও সবুজের সমন্বয় থাকলেও শব্দদূষণ একটি নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনার পর শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে হর্নমুক্ত গাজীপুর গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রথমে জেলা প্রশাসকের নিজের গাড়ি এবং পরে সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি হর্নমুক্ত করা হয়েছে। এ উদ্যোগে বাইকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকেও যুক্ত করা হয়েছে।
১২ সপ্তাহের বিশেষ কর্মপরিকল্পনার আওতায় শিল্প-কারখানার মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে ব্যক্তিগত ও পণ্যবাহী যানবাহনে অহেতুক হর্ন ব্যবহার বন্ধের আহ্বান জানানো হচ্ছে। জেলা প্রশাসক বলেন, দীর্ঘদিনের অভ্যাস একদিনে পরিবর্তন করা কঠিন হলেও এ উদ্যোগে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। চালকদের মধ্যেও অহেতুক হর্ন বাজানো যে অপরাধ, সে বিষয়ে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সেবা
গাজীপুরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যানজট ও জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক।
তিনি বলেন, নগরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) বাস্তবায়নের কাজ চলছে। সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার সেন্টার (এসটিসি) নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি শিল্পবর্জ্যের দূষণ বন্ধে ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) প্রতিষ্ঠায় সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছে জেলা প্রশাসন।
সাক্ষাৎকারের শেষভাগে মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, প্রশাসনে যে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করা হয়েছে, কর্মকর্তা বদলি হলেও ভালো চর্চা ও এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে। জনগণই এ পরিবর্তনের সুফল ধরে রাখবে এবং এর মাধ্যমে একটি সমন্বিত, সুন্দর ও সেবামুখী গাজীপুর গড়ে উঠবে।