
॥ মোঃ রিপন আলী ॥
মানসম্মত পরীক্ষার মাধ্যমে আইনজীবী তালিকাভুক্তি, পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগের বিচার এবং আইনজীবীদের মৃত্যুর পর আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা থাকায় বাংলাদেশ বার কাউন্সিল পেশাজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে।
‘বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনারস অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার-১৯৭২’ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ বার কাউন্সিল দেশের আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো নির্ধারিত পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিদের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা।
আইন বিষয়ে স্নাতক বা এলএলবি ডিগ্রি অর্জনের পর আইন পেশায় যুক্ত হতে আগ্রহী ব্যক্তিকে প্রথমে ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন আইনজীবীর অধীনে ছয় মাস শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করতে হয়। শিক্ষানবিশকাল শেষ হলে বার কাউন্সিলের তালিকাভুক্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া যায়।
তালিকাভুক্তির জন্য প্রথমে নৈর্ব্যক্তিক বা এমসিকিউ, এরপর লিখিত এবং সবশেষে মৌখিক পরীক্ষা দিতে হয়। তিন ধাপের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সনদ পাওয়া আইনজীবীরা জেলা আদালতে আইন পেশা পরিচালনা করতে পারেন।
হাইকোর্টে আইন পেশা পরিচালনার জন্য জেলা আদালতে অন্তত দুই বছর আইন পেশা পরিচালনাকারী আইনজীবীদের বার কাউন্সিলের হাইকোর্ট পারমিশন পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। তবে এলএলএম ডিগ্রিধারী আইনজীবীরা জেলা আদালতে এক বছর আইন পেশা পরিচালনার পর ওই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে বার কাউন্সিল থেকে হাইকোর্টে আইন পেশা পরিচালনার সনদ দেওয়া হয়।
আইনজীবী তালিকাভুক্তির বিষয়ে বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-বাসসকে বলেন, বার কাউন্সিলের অন্যতম প্রধান কাজ হলো আইনজীবী তালিকাভুক্ত করা। দীর্ঘদিন তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া নিয়মিত ছিল না। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর যতদূর সম্ভব প্রক্রিয়াটি নিয়মিত করা হয়েছে এবং এরই মধ্যে দুটি তালিকাভুক্তি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।
ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘যার নাই কোনো গতি, সে করে ওকালতি’—এমন কথিত ধারণা থেকে বের হয়ে আইন পেশার মান ও মর্যাদা বাড়ানোর পাশাপাশি মেধার চর্চা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে আইনজীবী তালিকাভুক্তির সিলেবাস সংশোধন করে যুগোপযোগী করা, বছরে দুটি পরীক্ষা নেওয়া এবং প্রশ্নের মান উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকৃত মেধাবীদের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত করাই লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ প্রসঙ্গে বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বলেন, সারা দেশের আইনজীবীদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় থেকে আইনজীবীদের প্রশিক্ষণের জন্য বার কাউন্সিলকে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে আইনজীবীরা আগামীতে প্রশিক্ষণ থেকে উপকৃত হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বার কাউন্সিলের গঠন
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ১৫ সদস্য নিয়ে গঠিত। বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল পদাধিকারবলে এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। বাকি ১৪ সদস্যের মধ্যে সাধারণ আসনের সাতজন সারা দেশের আইনজীবীদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন।
এ ছাড়া দেশের স্থানীয় বার অ্যাসোসিয়েশনগুলোকে সাতটি গ্রুপে—গ্রুপ-এ থেকে গ্রুপ-জি—বিভক্ত করা হয়। প্রতিটি গ্রুপ থেকে আইনজীবীদের ভোটে একজন করে মোট সাতজন সদস্য নির্বাচিত হন। সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ১৪ সদস্য নিজেদের প্রথম সভায় তাদের মধ্য থেকে একজনকে ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেন।
তবে ‘বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনারস অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২’-এর ক্ষমতাবলে গত ৩০ জুন ১৫ সদস্যের একটি অ্যাডহক বার কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এই অ্যাডহক বার কাউন্সিল ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত এক বছর দায়িত্ব পালন করবে।
বার কাউন্সিলে ১০ কমিটি
বার কাউন্সিলের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১০টি কমিটি রয়েছে। এগুলো হলো—এক্সিকিউটিভ কমিটি, এনরোলমেন্ট কমিটি, ফিন্যান্স কমিটি, লিগ্যাল এডুকেশন কমিটি, ল রিফর্ম কমিটি, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড লিগ্যাল এইড কমিটি, হাউস কমিটি, রিলিফ কমিটি, রোল অ্যান্ড পাবলিকেশন কমিটি এবং কমপ্লেইন্ট অ্যান্ড ভিজিল্যান্স কমিটি।
আইনজীবী তালিকাভুক্তি ও পরীক্ষা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে এনরোলমেন্ট কমিটি। এই কমিটির চেয়ারম্যান হন প্রধান বিচারপতি মনোনীত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি। প্রধান বিচারপতি মনোনীত হাইকোর্টের আরও দুজন বিচারপতি কমিটির সদস্য থাকেন। এ ছাড়া অ্যাটর্নি জেনারেল পদাধিকারবলে এবং বার কাউন্সিলের সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচিত একজন আইনজীবী এই কমিটির সদস্য হন।
অসদাচরণের অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে বিচার
আইনজীবীদের পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ তদন্ত ও বিচার করার জন্য বার কাউন্সিলের অধীনে ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। এই ট্রাইব্যুনাল আইনজীবীদের বিরুদ্ধে পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগের তদন্ত ও বিচার পরিচালনা করে।
সাক্ষ্য গ্রহণ, সমন জারি এবং অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালের দেওয়ানি কার্যবিধি অনুযায়ী ক্ষমতা রয়েছে। পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগে দোষী প্রমাণিত হলে তিন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এগুলো হলো তিরস্কার বা ভর্ৎসনা, আইনজীবীর সনদ সাময়িক বাতিল বা স্থগিত করা এবং পেশা থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার।
তবে বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদেশ পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে আপিল করতে পারেন।
আইনজীবীদের অসদাচরণের বিচার প্রসঙ্গে বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বাসসকে বলেন, কোনো আইনজীবীর বিরুদ্ধে পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ এলে অভিযুক্ত আইনজীবীকে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অভিযোগকারী ব্যক্তিকেও তার বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া হয়।
তিনি জানান, বার কাউন্সিলে বর্তমানে পাঁচটি ট্রাইব্যুনাল পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং এসব ট্রাইব্যুনালে অনেক অভিযোগ নিষ্পত্তি হচ্ছে। দেশের পেশাজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল একটি ‘রোল মডেল’ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বেনাভোলেন্ট ফান্ডে মৃত্যুর পর আর্থিক সহায়তা
কোনো আইনজীবী মারা গেলে তার মনোনীত ব্যক্তি বা পরিবার বার কাউন্সিলের বেনাভোলেন্ট ফান্ড থেকে আর্থিক অনুদান পেয়ে থাকে। আইনজীবী কত বছর চাঁদা দিয়েছেন, তার ভিত্তিতে মৃত্যুদাবির অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। ৪০ বছর বা তার বেশি সময় চাঁদা দেওয়া আইনজীবীর ক্ষেত্রে মৃত্যুদাবির অর্থ ১০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বেনাভোলেন্ট ফান্ড সম্পর্কে বার কাউন্সিলের সচিব (জেলা ও দায়রা জজ) মোহাম্মদ কামাল হোসেন সিকদার বাসসকে বলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়ার পর সর্বোচ্চ সাত কর্মদিবসের মধ্যে আইনজীবীর মৃত্যুদাবির টাকার চেক সংশ্লিষ্ট আইনজীবী সমিতির মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয়।
এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্ট সংলগ্ন ১৫ তলা বিশিষ্ট বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ভবনে আইনজীবীদের জন্য রেস্ট হাউজের সুবিধা রয়েছে। নির্ধারিত ভাড়া দিয়ে আইনজীবীরা সেখানে থাকার সুযোগ পান।