
সংসদীয় গণতন্ত্রকে কার্যকর, টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সরকার ও বিরোধী দল উভয় পক্ষকেই দায়িত্বশীল, সংযত ও গণতান্ত্রিক আচরণ করতে হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে নিজ কার্যালয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-বাসসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
হুইপ নিজান বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বর্তমান পর্যায়ে এসেছে। এটি কোনো একক রাজনৈতিক দলের অর্জন নয়; সরকার, বিরোধী দল ও জনগণের সম্মিলিত অর্জন। তাই গণতন্ত্রকে আরও এগিয়ে নিতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, সরকারকে যেমন ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে, তেমনি বিরোধী দলকেও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে হবে। এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত নয়, যাতে সরকার ও বিরোধী দল মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায়।
বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকার রয়েছে উল্লেখ করে হুইপ বলেন, কোনো কর্মসূচির কারণে দীর্ঘ সময় সড়ক অবরোধ, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, ব্যাপক বিশৃঙ্খলা বা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ওপর কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ তৈরি হয়। আবার সরকারের পদক্ষেপ অতিরিক্ত দমনমূলক হলে গণতন্ত্রের জন্য নতুন সংকট সৃষ্টি হতে পারে। তাই উভয় পক্ষকেই এমনভাবে দায়িত্বশীল হতে হবে, যাতে মুখোমুখি অবস্থানের পরিস্থিতি তৈরি না হয়।
এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, গণতন্ত্রের বর্তমান যাত্রাকে একটি নবজাতক শিশুর সঙ্গে তুলনা করা যায়। সরকার ও বিরোধী দল উভয়কেই এমনভাবে এ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধারণ করতে হবে, যাতে কোনো পক্ষের আচরণে এটি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে থাকা সমস্যাগুলো একদিনে কিংবা একটি সংসদের মেয়াদে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাস্তবায়ন করা গেলেও সেটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হবে।
হুইপ জানান, বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব এবং জুলাই চার্টারের বিষয়গুলো নিয়েও সংসদে আলোচনা হচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে যেখানে ঐকমত্য সম্ভব, সেখানে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সবকিছু অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন সম্ভব না হলেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ঐকমত্য তৈরি করে এগিয়ে যেতে হবে।
জুলাই চার্টারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দেওয়া মতামত ও ভিন্নমতকে সম্মান জানিয়ে সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হলেও তা যেন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল করার কারণ না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে হুইপ নিজান বলেন, জাতীয়তাবাদ শুধু স্লোগান বা বক্তৃতার বিষয় নয়; একজন রাজনৈতিক কর্মীর চিন্তা, আচরণ ও সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে এর প্রতিফলন ঘটতে হয়।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক চরিত্রের মধ্যে জাতীয়তাবাদ, দেশের স্বার্থের প্রতি অঙ্গীকার ও রাজনৈতিক সততার বিষয়গুলোতে মিল রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বেগম খালেদা জিয়ার মধ্যে দেশের স্বার্থ ও জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে দৃঢ়তা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করেছেন উল্লেখ করে হুইপ বলেন, একই ধরনের দৃঢ়তা তিনি তারেক রহমানের মধ্যেও দেখতে পান।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অন্ধ আনুগত্য পছন্দ করতেন না উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন রাজনৈতিক কর্মীর নিজের নেতার ভুল ধরিয়ে দেওয়ার অধিকার থাকা উচিত।
তিনি বলেন, ‘আমার কর্মী, আমার কলিগ আমাকে বলবে- আপনার এই বিষয়টি মনে হয় ঠিক হচ্ছে না। যদি ঠিক না হয়, আমি সংশোধন করে নেব। একজন নেতা তার কর্মীদের এ ধরনের মতামত গ্রহণের পরিবেশ তৈরি করবেন-এটাই নেতৃত্বের শক্তি।’
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের সংসদীয় কার্যক্রম প্রসঙ্গে হুইপ বলেন, অল্প সময়ের পর্যবেক্ষণেই তাঁর মধ্যে সংসদের প্রতি আগ্রহ, ধৈর্য ও দায়িত্ববোধ লক্ষ্য করেছেন তিনি।
সংসদে বিভিন্ন পর্যায়ের সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও অন্যরা নানা সমস্যা নিয়ে সংসদ নেতার সঙ্গে দেখা করতে আসেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যস্ততার মধ্যেও সংসদ নেতা বিরক্তি প্রকাশ করেন না, যা একটি অসাধারণ গুণ।
হুইপ নিজান বলেন, সংসদ সদস্যদেরও সময় ও পরিস্থিতি বুঝে সংসদ নেতার সঙ্গে দেখা করা উচিত। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা, স্পিকার বা বিরোধী দলের নেতার সঙ্গে আলোচনা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বিষয়ে আলোচনা চলাকালে ব্যক্তিগত বা স্থানীয় সমস্যা নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে দেখা না করাই সংসদীয় শিষ্টাচারের অংশ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সংসদে উপস্থিতি ও অংশগ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, সংসদকে কার্যকর করতে শুধু নিয়ম রক্ষা যথেষ্ট নয়; সংসদের প্রতি আন্তরিক আগ্রহ ও ভালোবাসাও প্রয়োজন। সংসদ নেতা তারেক রহমান পার্লামেন্টকে ভালোবেসে ফেলেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি গণতন্ত্রের জন্য একটি শুভ যাত্রা।
রাজনৈতিক নৈতিকতা প্রসঙ্গে হুইপ বলেন, আন্দোলন-সংগ্রামের সময় অনেক রাজনৈতিক কর্মী ত্যাগ স্বীকার করেন। কিন্তু আন্দোলন সফল হওয়ার পর ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে সেখানেই একজন রাজনৈতিক কর্মীর প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয়।
ক্ষমতা বা প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করলে রাজনৈতিক আদর্শ ও বাস্তব আচরণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, দখল, কালোবাজারি, মাদক বা মানব পাচারের মতো কর্মকাণ্ড কোনো রাজনৈতিক দলের ঘোষিত আদর্শের অংশ হতে পারে না। দলের নেতাকর্মীদের এসব কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকতে হবে।
গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে শুধু নির্বাচনে জয়ী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকলেই হবে না, পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতাও থাকতে হবে বলে মন্তব্য করেন হুইপ নিজান। তাঁর মতে, নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় জয়-পরাজয় স্বাভাবিক বিষয়।
তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতা চিরকাল ক্ষমতায় থাকবে—এমন ধারণা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে, নির্বাচন হবে এবং সরকার ও বিরোধী দল থাকবে—এটাই গণতন্ত্র। তবে দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য থাকা প্রয়োজন।
রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা ব্যক্তিদের নিজেদের আচরণের মাধ্যমে সততা ও ন্যায়বোধ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, একজন রাজনৈতিক নেতা অন্যদের সৎ থাকার নির্দেশ দিয়ে নিজে অনৈতিক সুবিধা নিলে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার না করে জনগণের স্বার্থে পরিচালনা করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক কর্মী ও নাগরিক সমাজ—সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্বের জায়গা থেকে সততার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা যেহেতু স্টিয়ারিং সিটে আছি, আমরা যেহেতু সরকারে আছি, কমান্ডে আছি, পাইলট হিসেবে আছি, আমাদের কোরবানি এখানে সবচেয়ে বেশি থাকতে হবে।’
হুইপ বলেন, গণতন্ত্র শক্তিশালী করার দায়িত্ব শুধু সরকার বা সংসদের নয়। বিরোধী দল, রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষেরও এতে ভূমিকা রয়েছে। সরকারকে বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিরোধী দলকেও এমন কর্মসূচি থেকে বিরত থাকতে হবে, যা জনজীবন বিপর্যস্ত করে বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়।
গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে সংসদকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা, সংসদীয় শিষ্টাচার, রাজনৈতিক সংযম ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বর্তমান সংসদের সামনে বড় দায়িত্ব রয়েছে উল্লেখ করে হুইপ নিজান বলেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে সরকার ও বিরোধী উভয় পক্ষকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, সবকিছু একবারে সম্ভব হবে না। তবে বড় জায়গাগুলোতে অগ্রগতি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা গেলে সেটিই ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়ার ভিত্তি তৈরি করবে।
সূত্র:
(বাসস)