অবৈধ দখল উচ্ছেদের পর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও হোপ স্কুল রোডের ফুটপাতে ফিরেছে স্বাভাবিক পরিবেশ। নির্বিঘ্নে হাঁটতে পারছেন পথচারীরা, কমেছে যানজট ও ভোগান্তি; উদ্যোগে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও চালকেরা।
দীর্ঘদিন পর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের ফুটপাত দিয়ে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটতে পেরে আবেগাপ্লুত শরীফুল ইসলাম। প্রায় ২০ বছর ধরে মিরপুরে বসবাস করলেও দুই সন্তানের হাত ধরে এই পথে হাঁটার সুযোগ এবারই প্রথম পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
শরীফুল ইসলামের মতো স্বস্তি এখন মিরপুরের অনেক বাসিন্দার। একসময় যেখানে ফুটপাতে হাঁটার জায়গা পাওয়া কঠিন ছিল, সেখানে এখন শিক্ষার্থী, অভিভাবক, চাকরিজীবী ও বয়স্কসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সড়ক ও ফুটপাত পরিষ্কার করছেন। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের ফুটওভার ব্রিজের নিচে যে অংশটি এতদিন অবৈধ দখলে ছিল, সেখানে গাছ লাগিয়ে পথচারীবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দোকানপাট ও অতিরিক্ত ভিড়ের চেনা চিত্রও অনেকটাই বদলে গেছে।
কিছুদিন আগেও মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও হোপ স্কুল রোডের পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। সড়কের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশজুড়ে গড়ে উঠেছিল অবৈধ ফুটপাতের বাজার। বিশেষ করে হোপ স্কুল ও মিরপুর গার্লস আইডিয়াল স্কুলের সামনের ফুটপাত ও সড়কে সারি সারি দোকান বসায় পথচারী ও যানবাহনের চলাচল ব্যাহত হতো।
দোকানগুলো থেকে হকারদের উচ্চস্বরে ডাকাডাকির পাশাপাশি গোলচত্বর থেকে পূর্বদিকে যাওয়া তিনটি সড়কের মুখে তৈরি হতো মানুষের ভিড় ও যানজট। এতে নিয়মিত দুর্ভোগে পড়তেন পথচারী ও যানবাহনের চালকেরা।
এই পরিস্থিতি বিবেচনায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান চালায় ডিএনসিসি। এরপর মিরপুর-১০ ও হোপ স্কুলের সামনের অবৈধ ফুটপাতের বাজার পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে যায়। উচ্ছেদ অভিযানে এলাকার সাধারণ মানুষও সিটি করপোরেশনকে সহযোগিতা করেন।
ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বাসসকে বলেন, এই উদ্যোগ শুধু মিরপুরে সীমাবদ্ধ থাকবে না; উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রতিটি এলাকার ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করা হবে। উচ্ছেদের পর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ আবার দোকান বসিয়ে মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জরিমানার পাশাপাশি দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, নগরবাসী যাতে সুন্দর, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও নিরাপদ পরিবেশে চলাচল করতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সড়ক ও ফুটপাত দখল করে অবৈধ ব্যবসা পরিচালনার বিরুদ্ধে উচ্ছেদ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
হকারদের পুনর্বাসন প্রসঙ্গে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, জীবিকার প্রয়োজনে হকারদের ব্যবসার সুযোগ থাকবে, তবে তা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে নয়। সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানেই তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। মানুষের চলাচলের পথ কারও দখলে ছেড়ে দেওয়া হবে না।
উচ্ছেদ অভিযানের সুফল পাচ্ছেন সড়কে দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরাও। মিরপুর-১০ নম্বরে দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক সার্জেন্ট আব্দুল আজিজ বাসসকে বলেন, আগে ফুটপাত দখল থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে সড়ক দিয়ে হাঁটত। ফলে যানজটও তৈরি হতো। এখন সড়ক অনেকটা ফাঁকা, যানজট কমেছে। ফুটপাতে মানুষ হাঁটছেন এবং সড়কে যানবাহন চলছে। এতে ট্রাফিক পুলিশের কাজের চাপও কমেছে।
ঢাকার নর্থ সিটি কলেজের প্রভাষক আবু বক্কর সরকারও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, একজন নাগরিক হিসেবে তাঁর প্রত্যাশা, ফুটপাত সবসময় দখলমুক্ত থাকবে, যাতে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে ও নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। একই সঙ্গে পুরো সিটি করপোরেশন এলাকার ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার দাবি জানান তিনি।
মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটের এক শিক্ষক বলেন, ফুটপাত দখলমুক্ত করা ছিল দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। আগে এই রাস্তা দিয়ে হাঁটলে স্বস্তি পাওয়া যেত না। এখন পরিবেশ অনেক ভালো হয়েছে বলে জানান তিনি।
স্বস্তি ফিরেছে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও। মিরপুরের বাসিন্দা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শেখ অহোনা বাসসকে বলেন, প্রতিদিন মিরপুর-১০ থেকে মেট্রোরেলে করে ক্যাম্পাসে যেতে হয়। আগে দোকান ও ভিড়ের কারণে বাসা থেকে স্টেশনে পৌঁছাতেই অনেক সময় লাগত এবং প্রায়ই ক্লাসে দেরি হতো। এখন খোলা ফুটপাত দিয়ে কয়েক মিনিটেই স্টেশনে পৌঁছানো যায়। সন্ধ্যায় ক্লাস শেষে ফেরার সময়ও নিশ্চিন্তে হাঁটতে পারছেন তিনি।
সন্তানকে নিয়ে মিরপুর গার্লস আইডিয়াল স্কুল থেকে ফিরছিলেন এক অভিভাবক। তিনি বলেন, এমন পরিবেশে আগে কখনো হাঁটা হয়নি। এখন সন্তানকে নিয়ে স্বস্তিতে হাঁটতে পারছেন।
ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় স্থায়ী ব্যবসায়ীরাও সুফল পাচ্ছেন। শাহ আলী প্লাজার বিক্রেতা শাহজাহান বাসসকে বলেন, উচ্ছেদের পর রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়েছে। আগে যারা ফুটপাত থেকে কেনাকাটা করতেন, তাদের অনেকে এখন মার্কেটে আসছেন। এতে দীর্ঘদিন ধরে মার্কেটে ব্যবসা করা দোকানিদের বেচাকেনা বেড়েছে।
মিরপুরের বাসিন্দা আনোয়ার জাহিদ বলেন, প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি মিরপুরে বসবাস করছেন। একসময় এই সড়ক খোলামেলা ছিল। পরে ফুটপাতের দোকানের কারণে হাঁটার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায় এবং মার্কেটের দোকানগুলোর বেচাকেনাও কমে গিয়েছিল। এখন রাস্তাঘাট অনেক পরিচ্ছন্ন বলে জানান তিনি।
যানবাহনের চালকরাও পরিবর্তনের সুফল পাচ্ছেন। গাড়িচালক আমির বলেন, আগে মিরপুর-১০ থেকে বিআরটিএ পর্যন্ত যেতে অনেক সময় লাগত। এখন খুব দ্রুত সড়কটি পার হওয়া যাচ্ছে।
পথচারী শহীদুল ইসলাম বলেন, আগে এই পথটুকু পার হতে প্রায় ২০ মিনিট সময় লাগত। এখন তিন-চার মিনিটেই পার হওয়া যায়। পুরো ঢাকা শহর এমন সুন্দর ও নিরাপদ থাকুক—এটাই তাঁর প্রত্যাশা।
নিরাপত্তার বিষয়েও স্বস্তি প্রকাশ করেছেন নগরবাসী। বেসরকারি একটি ক্যাবল কোম্পানির এক কর্মী বাসসকে বলেন, আগে ভিড়ের মধ্যে পকেটমারের ভয় ছিল। এখন নির্বিঘ্নে চলাচল করা যাচ্ছে।
আরেক পথচারী শফিক শাকিল বলেন, সকালে হাঁটতে বের হয়ে দেখেছেন, আগের মতো ফুটপাতজুড়ে দোকানের সারি নেই। পুরো পথ খোলা রয়েছে। সরকারের এ উদ্যোগের প্রশংসা করেন তিনি।
দখলমুক্ত ফুটপাতে এমন পরিবর্তনে খুশি মিরপুরবাসী। তাদের প্রত্যাশা, মিরপুর-১০ নম্বরের মতো নগরীর অন্যান্য এলাকার ফুটপাতও পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় চলাচলের পরিবেশ নিশ্চিত হবে।
মন্তব্য করুন