শিল্পকারখানায় গ্যাসের সরবরাহ ও চাপ বাড়ায় উৎপাদন পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। গ্যাসনির্ভর অনেক কারখানা স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরেছে এবং সম্প্রতি উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত রাখা কারখানাগুলোও ধীরে ধীরে পুরোদমে চালু হচ্ছে।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সচিবালয়ে ব্যবসায়ী নেতা ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ দেড় মাস আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানান। এরপর থেকেই শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তারা।
পেট্রোবাংলার দৈনিক গ্যাস সরবরাহের তথ্য অনুযায়ী, ২২ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে গড়ে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ হয়েছে। এক মাস আগে দৈনিক সরবরাহ ছিল প্রায় ২ হাজার ৩০০ এমএমসিএফডি। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৩০০ এমএমসিএফডি বেড়েছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি এস এম ফজলুল হক বাসসকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে অধিকাংশ কারখানা উৎপাদনে ফিরেছে। গত মাসে উৎপাদন বন্ধ রাখা বা কমিয়ে দেওয়া অনেক কারখানাও আবার উৎপাদন শুরু করেছে।
তিনি বলেন, গ্যাসের সরবরাহ আরও বাড়বে বলে তাঁরা আশা করছেন। সরকার দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে বর্তমান সরবরাহ এখনো শিল্পের চাহিদার তুলনায় কম।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সভাপতি ও ইভেন্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, বর্তমানে গাজীপুরে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি অনেক ভালো। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কোনো শিল্পকারখানা বন্ধ আছে বলে তাঁদের জানা নেই।
তিনি বাসসকে বলেন, শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ ও সরবরাহ আগের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ উন্নত হয়েছে। তবে আশুলিয়ার কিছু এলাকায় এখনো ডিজেলের সহায়তায় কারখানা চালাতে হচ্ছে। অন্যান্য এলাকায় গ্যাস-বিদ্যুতের পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক ভালো এবং কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়াও বেশ স্বাভাবিক রয়েছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নত করতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। বর্তমানে অনেক এলাকায় গ্যাস সরবরাহ স্থিতিশীল হয়েছে। দুই-তিন সপ্তাহ আগেও যেসব এলাকায় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল না, সেখানেও এখন সরবরাহ রয়েছে।
তিনি বলেন, তৈরি পোশাক খাত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। তাই এ খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে শুধু এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর না করে দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহের বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সাম্প্রতিক উৎপাদন ঘাটতি ধীরে ধীরে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, স্পিনিং ও ডাইং শিল্পে উৎপাদন বাড়লে রপ্তানিও বাড়তে পারে।
তবে শিল্পোদ্যোক্তাদের মতে, শুধু সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো যথেষ্ট নয়; দীর্ঘমেয়াদে নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। গ্যাসের চাপ বারবার ওঠানামা করলে উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শিল্পকারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা গেলে উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন বাড়ানো এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানো সম্ভব হবে।
মন্তব্য করুন