চীনের তিয়ানগং মহাকাশ স্টেশনে নভোচারীদের খাবারের তালিকায় এখন প্রায় ২০০ ধরনের খাবার রয়েছে। গরম খাবার তৈরি থেকে শুরু করে মহাকাশে শাকসবজি উৎপাদনের পরীক্ষাও চালাচ্ছে দেশটি। ভবিষ্যতে চাঁদেও ‘চন্দ্র সবজিবাগান’ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
মহাকাশে ওজনহীন পরিবেশে নভোচারীদের খাবার শুধু পুষ্টির বিষয় নয়, মানসিক স্বস্তিরও অংশ হয়ে উঠেছে। চীনের তিয়ানগং মহাকাশ স্টেশনে এখন চিকেন, তোফু, ভাজা ভাত, মাংসের ডাম্পলিংয়ের পাশাপাশি গরম কেক ও মুরগির ডানা ভাজার মতো খাবারও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
তিয়ানগং মহাকাশ স্টেশন ধীরে ধীরে শুধু গবেষণাগার হিসেবে নয়, নভোচারীদের দীর্ঘ সময় অবস্থানের উপযোগী একটি আবাস হিসেবেও গড়ে উঠছে। সেখানে বর্তমানে প্রায় ২০০ ধরনের খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে।
চীনের প্রথম নভোচারী ইয়াং লিওয়েইয়ের মহাকাশযাত্রার সঙ্গে বর্তমান ব্যবস্থার পার্থক্যটি স্পষ্ট। ২০০৩ সালে শেনঝৌ-৫ অভিযানে তিনি এক দিনেরও কম সময় মহাকাশে ছিলেন। তখন তাঁর খাবারের তালিকায় ছিল এমন প্যাকেটজাত খাবার, যা গরম করার সুযোগ ছিল না।
সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান নভোচারীদের খাবারের বৈচিত্র্য নিয়ে রসিকতা করে ইয়াং লিওয়েই বলেন, তাঁদের খাবার দেখে তিনি ঈর্ষা করেন। এখন নভোচারীরা গরম বাতাসে খাবার তৈরির যন্ত্র ব্যবহার করতে পারেন এবং মুরগির ডানাও বেক করে খেতে পারেন।
তবে মহাকাশে খাবার তৈরি পৃথিবীর মতো সহজ নয়। ওজনহীন পরিবেশে খাবারের কণা বা তরল ফোঁটা ভেসে গিয়ে মহাকাশযানের যন্ত্রপাতিতে ঢুকে ত্রুটি তৈরি করতে পারে। এর সঙ্গে মহাজাগতিক বিকিরণ ও আবদ্ধ পরিবেশও বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন তৈরি করে।
এ কারণে ইউরি গ্যাগারিনের সময় থেকে দীর্ঘদিন মহাকাশচারীদের খাবার হিসেবে মাখনের মতো নরম খাবার ও চাপ দিয়ে তৈরি শক্তি বার ব্যবহৃত হয়ে এসেছে।
মহাকাশের খাবার শুধু পুষ্টির জোগান নয়, ঘরের অনুভূতিও ফিরিয়ে দিতে পারে। এর একটি উদাহরণ চীনের নভোচারী ওয়াং ইয়াপিং।
২০১৩ সালে শেনঝৌ-১০ অভিযানে ১৫ দিন মহাকাশে ছিলেন ওয়াং ইয়াপিং। সে সময় তাঁর মহাকাশযাত্রার সঙ্গে ড্রাগন বোট উৎসবের সময় মিলে যায়। এ উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী চীনা খাবার জোংজি—পাতায় মোড়ানো চালের পিঠার মতো খাবার—বিশেষভাবে মহাকাশযানের খাবারের তালিকায় রাখা হয়। মহাকাশে ভাসমান অবস্থায় হাতে জোংজি ধরে থাকা ওয়াংয়ের ছবিও ব্যাপকভাবে পরিচিতি পায়।
আট বছর পর শেনঝৌ-১৩ অভিযানে তিয়ানগং মহাকাশ স্টেশনে ছয় মাস কাটান ওয়াং। সে সময়ও তাঁর খাবারে ব্যক্তিগত পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সমুদ্রের কাছাকাছি বেড়ে ওঠায় তাঁর জন্য সামুদ্রিক খাবারের পুরভরা ডাম্পলিং তৈরি করা হয়েছিল। আর সিচুয়ান প্রদেশে জন্ম নেওয়া নভোচারী ইয়ে গুয়াংফুর জন্য রাখা হয়েছিল ঝাল খাবার।
তিয়ানগংয়ের মূল মডিউল তিয়ানহেতে কাজ, ঘুম, খাওয়া ও ব্যায়ামের জন্য আলাদা জায়গা রয়েছে। শেনঝৌ-১৩ অভিযানের নভোচারীদের মহাকাশে চীনা ক্যালিগ্রাফি অনুশীলন ও তাইচি করার ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাড়া ফেলেছিল।
চীন ২০২২ সালে তিয়ানগং মহাকাশ স্টেশনের নির্মাণকাজ শেষ করে। একটি মূল মডিউল ও দুটি গবেষণাগার মডিউল নিয়ে তৈরি এই কক্ষপথের স্থাপনাটির আয়তন প্রায় ১১০ বর্গমিটার। সেখানে অক্সিজেন পুরোপুরি পুনরুৎপাদন করা যায় এবং ব্যবহৃত পানির ৯৫ শতাংশের বেশি পুনরুদ্ধার সম্ভব।
বর্তমানে সেখানে একসঙ্গে সর্বোচ্চ ছয়জন নভোচারী থাকতে পারেন। দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশযাত্রাও ধীরে ধীরে নিয়মিত হচ্ছে। শেনঝৌ-২৩ অভিযানের একজন নভোচারী বর্তমানে এক বছর কক্ষপথে থাকার মিশনে রয়েছেন।
ওজনহীন পরিবেশে হাড় থেকে ক্যালসিয়াম কমে যায় এবং পেশির ক্ষয় হয়। এ কারণে মহাকাশের খাবারে বেশি ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন, কম সোডিয়াম এবং খাদ্যআঁশের ভারসাম্য রাখা জরুরি। চীনের নভোচারী কেন্দ্রের গবেষকেরা এমন খাবার তৈরির চেষ্টা করছেন, যা শরীরে অক্সিডেটিভ ক্ষতি কমানো, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ধরে রাখা, ক্লান্তি কমানো এবং অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।
তবে পুষ্টির পাশাপাশি খাবারের স্বাদও গুরুত্বপূর্ণ। ওজনহীন পরিবেশে শরীরের রক্ত মাথার দিকে বেশি সরে যাওয়ায় নাক বন্ধ থাকার মতো অনুভূতি তৈরি হতে পারে। এতে ঘ্রাণশক্তি অন্তত ৩০ শতাংশ কমে যেতে পারে। যেহেতু স্বাদ অনেকটাই ঘ্রাণের ওপর নির্ভরশীল, তাই নভোচারীদের কাছে খাবার অনেক সময় বিস্বাদ মনে হয়।
এ সমস্যা মোকাবিলায় খাবারে তুলনামূলক তীব্র স্বাদ যোগ করা হচ্ছে। খাবারের তালিকায় তরল সয়া সস ও ঘন মরিচের সসও রাখা হচ্ছে।
নভোচারীদের খাবারের ব্যবস্থা উন্নত করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে চীন। দেশটির নভোচারী কেন্দ্র বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে মহাকাশের ‘রান্নাঘর’ আধুনিক করেছে। সেখানে পানি গরম ও পান করার ব্যবস্থা, খাবার পুনরায় গরম করার যন্ত্র এবং বেকিংয়ের বিশেষ সরঞ্জাম যুক্ত হয়েছে।
এর ফলে এখন কক্ষপথে নভোচারীরা প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে গরম খাবার পেতে পারেন। আগে তাঁদের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হতো অথবা ঠান্ডা খাবার খেতে হতো।
চীনের নভোচারী কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ লিউ ওয়েইবো জানান, গরম বাতাসে খাবার বেক করার বিশেষ চুল্লিটি মহাকাশে ব্যবহারের জন্য চীনের তৈরি নতুন নকশার একটি যন্ত্র। এটি রান্নার ধোঁয়া দ্রুত সরিয়ে দিতে পারে। ফলে মহাকাশেও বারবিকিউ ধরনের খাবার তৈরি করা সম্ভব।
গত মাসে হংকং ও ম্যাকাওয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত মহাকাশবিষয়ক এক পাঠে শেনঝৌ-২৩ অভিযানের নভোচারী লি জিয়াইং সদ্য বেক করা কেক দেখান। হংকংয়ের এই নভোচারী বলেন, কেকটি তাঁকে তাঁর নিজের শহরের জনপ্রিয় ডিমের ওয়াফলের কথা মনে করিয়ে দেয়।
মহাকাশে খাবারের বৈচিত্র্যও বাড়ছে। ফলমূল ও সবজির পাশাপাশি হিমায়িত স্টেক ও মুরগির ডানাও পাঠানো হচ্ছে। ভবিষ্যতে কক্ষপথে সরবরাহের জন্য তৈরি চীনের নতুন প্রজন্মের মালবাহী মহাকাশযান ছিংঝৌতে আরও বড় পরিসরে ঠান্ডা পরিবহনের ব্যবস্থা থাকবে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশযাত্রায় পৃথিবী থেকে খাবার পাঠানোর ওপর নির্ভরতা কমানোই বড় লক্ষ্য। চীনের নভোচারী কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ বিয়ান ছিয়াং বলেন, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে জীবনধারণের গবেষণার উদ্দেশ্য হলো এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে পানি, বাতাস ও খাবার মহাকাশেই পুনরুৎপাদন করা যাবে।
২০২৩ সালের শেনঝৌ-১৬ অভিযানের পর থেকে চীন মহাকাশে বিভিন্ন উদ্ভিদ উৎপাদনের পরীক্ষা চালিয়ে আসছে। এখন পর্যন্ত ১৪টি উদ্ভিদ প্রজাতির ২০টির বেশি জাত নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে লেটুস, গাজর, আলু ও গম।
২০২৪ সালে শেনঝৌ-১৮ অভিযানের নভোচারীদের একটি ‘অ্যাকুয়ারিয়ামে’ মাছ পালনের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল। মহাকাশের পরিবেশ মাছের বেড়ে ওঠায় কী প্রভাব ফেলে, তা জানাই ছিল এ গবেষণার উদ্দেশ্য। গবেষণা সফল হলে ভবিষ্যতে নভোচারীরা মহাকাশে উৎপাদিত মাছ খেতে পারবেন বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।
চীন ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে নভোচারী পাঠানোর লক্ষ্য নিয়েছে। পৃথিবী থেকে দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে চাঁদে খাবার সরবরাহ আরও কঠিন হবে। তাই সেখানে খাবার উৎপাদনের পরিকল্পনাও করছে দেশটি।
বিয়ান ছিয়াং বলেন, “আমরা চাঁদে একটি চীনা ‘চন্দ্র সবজিবাগান’ তৈরির পরিকল্পনা করছি।”
অর্থাৎ মহাকাশে খাবারের ভবিষ্যৎ শুধু পৃথিবী থেকে প্যাকেট পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। খাবার গরম ও বেক করার পাশাপাশি মহাকাশেই শাকসবজি ও অন্যান্য খাদ্য উৎপাদনকে দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানের অংশ হিসেবে দেখছে চীন।
দীর্ঘ সময় মহাকাশে মানুষের অবস্থান নিশ্চিত করতে খাবার তাই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চীন মহাকাশে নিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর পরিচিত খাবারের স্বাদ এবং একই সঙ্গে গড়ে তুলছে মহাকাশে খাদ্য উৎপাদনের প্রযুক্তি।
সূত্র: সিনহুয়া
মন্তব্য করুন