জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার নিজের কাছে রেখে সন্তান, নাতি-নাতনি কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দানের সুযোগ রেখে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট-২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। নতুন এ আইনে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণের পৃথক বিধান যুক্ত হয়েছে।
ঢাকা, ৩ অক্টোবর, ২০২৬ (বাসস): সম্পত্তি দানের পরও দাতার জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষণের সুযোগ রেখে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে নতুন বিধান যুক্ত হয়েছে। জাতীয় সংসদে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট-২০২৬’ পাসের মাধ্যমে এ বিধান কার্যকর হয়েছে।
নতুন আইনে ‘জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দান’ নামে একটি পৃথক পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর আওতায় সম্পত্তির মালিকানা গ্রহীতার অনুকূলে হস্তান্তর হলেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগদখল ও ব্যবহার করতে পারবেন।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বাসসকে বলেন, সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নতুন একটি দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। এ আইন হেবা, গিফট বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কোনো বাধা বা ক্ষতি সৃষ্টি করবে না।
তিনি বলেন, কেউ হেবা করতে চাইলে তা করতে পারবেন। অন্য কোনো আইনের অধীনেও সম্পত্তি হস্তান্তর করা যাবে। নতুন বিধানটি এসব পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে যুক্ত হয়েছে।
ইসলামী আইন বা হেবা পদ্ধতির সঙ্গে সংশোধিত আইনের কোনো বৈপরীত্য নেই উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘ইসলামিক ল’ বা হেবা আইনের ওপর কারও হাত দেওয়ার ক্ষমতা নেই। আমরা সেখানে হাত দিইনি। আমরা হেবাকে সংরক্ষণ করেছি। আইনের মধ্যে এক্সপ্রেসলি সেটা বলেছি।’
তিনি আরও বলেন, একটি গোষ্ঠী এ বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি করার চেষ্টা করছে। তবে সাধারণ মানুষ আইনটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরাও ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬’-কে সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট একলাছ উদ্দিন ভূঁইয়া বাসসকে বলেন, আইনটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ এবং দেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামোয় এটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
তিনি বলেন, সংশোধিত আইনের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বাবা-মা, দাদা-দাদি বা নানা-নানি, সন্তান-সন্ততি কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান করার পরও দাতা নিজের জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার নিজের কাছে রাখতে পারবেন। তার মতে, এটি সময়োপযোগী সংশোধনী।
সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত সংশোধনী আইনটি যথাযথভাবে সর্বত্র প্রয়োগের প্রত্যাশা জানিয়ে একলাছ উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, সন্তানকে সম্পত্তি হস্তান্তরের পর পিতা-মাতার করুণ পরিণতির অনেক ঘটনা দেখা গেছে। পিতা-মাতার প্রতি সন্তানদের অবজ্ঞারও বহু নজির রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সাংবিধানিক আইনের অধীনে পরিচালিত হয়। প্রচলিত আইনি কাঠামোর মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত পুরোনো আইন সংশোধন করে জাতীয় সংসদ যে বিধান নিশ্চিত করেছে, এজন্য সরকারকে স্বাগত জানাই।
সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ছিদ্দিক উল্লাহ্ মিয়া বলেন, ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট-২০২৬’ অনুযায়ী সম্পত্তি হস্তান্তর বা দানের ক্ষেত্রে দাতার জীবনকালীন নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত হবে। দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তির পূর্ণ ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার নিজের কাছে অক্ষুণ্ন রেখেই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মালিকানা হস্তান্তর করতে পারবেন।
তিনি বলেন, সংশোধিত আইনটি সমাজের জন্য ইতিবাচক। এটি পিতা-মাতার প্রতি সন্তানদের দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতা এবং পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে। পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্বহীন ও অমানবিক আচরণ প্রতিরোধে এ আইন সময়োপযোগী।
ছিদ্দিক উল্লাহ্ মিয়া বলেন, পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা এবং প্রবীণ বয়সে নিজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা—এই দুই বিষয়কে সমন্বয় করে আইনি সমাধানের সুযোগ তৈরি করবে নতুন বিধানটি।
জাতীয় সংসদে পাস এবং রাষ্ট্রপতির সম্মতি পাওয়ার পর গত ৮ সেপ্টেম্বর আইনটি সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয়। এটি ২০২৬ সালের ১০৫ নম্বর আইন। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর অধিকতর সংশোধনের জন্য আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রকাশিত গেজেটে বলা হয়েছে, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর অধীন জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দানের বিধান সুনির্দিষ্ট করা এবং ওই ভোগাধিকার সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় বিধান প্রণয়ন করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়। আইনটির নাম হবে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬’ এবং এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
আইনের ধারা ১২২ক-তে জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে দানের বিষয়ে বলা হয়েছে, এই আইন বা বর্তমানে বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা-ই থাকুক না কেন, কোনো দাতা তার জীবদ্দশায় কোনো সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার নিজের জন্য সংরক্ষণ করে স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি দান করলে সেই দান বৈধ হবে।
এই দান বৈধ হওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সম্পর্কের বিধান রাখা হয়েছে। পিতা বা মাতা তাদের সন্তান বা সন্তানদের; দাদা-দাদি বা নানা-নানি তাদের নাতি বা নাতনিকে; সন্তান তার পিতা-মাতা বা দাদা-দাদিকে; নাতি-নাতনি তাদের দাদা-দাদি বা নানা-নানিকে এবং স্বামী ও স্ত্রী পরস্পরকে এ ধরনের সম্পত্তি দান করতে পারবেন।
স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে এ ধারার অধীনে ঘোষণা এবং রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ অনুযায়ী নিবন্ধিত দলিল সম্পাদনের মাধ্যমে দান করতে হবে।
দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতা মারা গেলে আইন অনুযায়ী সম্পত্তিটি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তরিত হবে। তবে সম্পত্তির ওপর দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার বহাল থাকবে এবং সম্পত্তির সঙ্গে তা সংযুক্ত থাকবে। অর্থাৎ গ্রহীতা মারা গেলেও দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগের অধিকার নষ্ট হবে না।
আইনে এ ধরনের সম্পত্তি হস্তান্তরকে একটি স্বতন্ত্র বা পৃথক হস্তান্তর পদ্ধতি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ফলে এ আইন বা অন্য কোনো প্রচলিত আইনে স্বীকৃত সাধারণ দান, হেবা কিংবা অন্য বৈধ হস্তান্তর পদ্ধতির বৈধতা সীমিত, ক্ষুণ্ন বা প্রভাবিত হবে না।
ধারা ১২২খ-তে জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দানের অধিকার পরিবর্তন বা বাতিলের বিষয়েও বিধান রাখা হয়েছে। কোনো দান একবার নিবন্ধিত হলে সাধারণভাবে তা অপ্রত্যাহারযোগ্য হবে। তবে দাতা ও গ্রহীতা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে দানের ফলে সৃষ্ট অধিকার পরিবর্তন, বাতিল বা অন্যভাবে ব্যবস্থা করতে পারবেন।
এ ধরনের পরিবর্তন বা বাতিলের ক্ষেত্রে আর্থিক, চিকিৎসাগত, শিক্ষাগত, পারিবারিক কিংবা অন্য কোনো প্রকৃত ও যৌক্তিক প্রয়োজনের বিষয় বিবেচনায় নেওয়া যাবে।
কোনো পক্ষের সম্মতি নেওয়া সম্ভব না হলে—যেমন অপ্রাপ্তবয়স্ক, নিখোঁজ, মানসিকভাবে অক্ষম, আইনগতভাবে অক্ষম বা অন্য কোনো যথেষ্ট কারণে—অন্য পক্ষ জেলা জজের কাছে আবেদন করতে পারবেন।
জেলা জজ ধারা ১২২ক-এর অধীনে সৃষ্ট অধিকার পরিবর্তন, বাতিল বা অন্যভাবে ব্যবস্থাপনার অনুমতি দিতে পারবেন, যদি উল্লিখিত প্রয়োজনগুলোর কোনো একটি বিদ্যমান থাকে।
এ ধরনের আবেদন নিষ্পত্তির আগে জেলা জজকে সম্পত্তি বা সংশ্লিষ্ট অধিকারে স্বার্থ রয়েছে এমন সব ব্যক্তিকে নোটিশ দিতে হবে। প্রয়োজন মনে করলে তিনি যথাযথ তদন্ত বা অনুসন্ধান করতে পারবেন এবং আবেদনটি সৎ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও নিশ্চিত হতে হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন বিধানটি একটি সুষম আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থা। পারিবারিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি প্রবীণদের আত্মমর্যাদা এবং আর্থসামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: বাসস
মন্তব্য করুন