আধুনিক জীবনযাপন, নগরায়ণ, প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদন, অর্থনৈতিক সংকট ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ সংস্কৃতির বিভিন্ন ধারা এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। তবে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগও রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একসময় সন্ধ্যা নামলেই গ্রামবাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বাউল, ভাটিয়ালি, জারি-সারি ও পালাগানের সুর শোনা যেত। শীতের রাতে বসত যাত্রাপালা, মেলা ও কবিগানের আসর। নবান্ন, পৌষসংক্রান্তি এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব ঘিরে জমে উঠত নানা লোকজ আয়োজন। ঢোল, একতারা, দোতারা, বাঁশি ও সারিন্দার সুরে প্রাণ ফিরে পেত জনপদ।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সেই চিত্রও বদলে গেছে। বাংলার মাটি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত লোকজ সংস্কৃতির অনেক ধারা এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে। বাউল, মুরশীদি, ভাটিয়ালি, জারি, সারি, গম্ভীরা ও কবিগানের চর্চা অনেক এলাকায় প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
গ্রামীণ বিনোদনের জায়গা দখল করেছে টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ভিডিওসহ নানা ধরনের ডিজিটাল মাধ্যম। এর পাশাপাশি আধুনিক জীবনযাপন, দ্রুত নগরায়ণ, অর্থনৈতিক সংকট এবং পৃষ্ঠপোষকতার অভাবও লোকজ সংস্কৃতির চর্চায় প্রভাব ফেলছে।
লোকজ শিল্পীদের বড় একটি অংশ নিয়মিত কাজ না পাওয়ায় পেশা পরিবর্তন করছেন। ফলে তাঁদের সঙ্গে থাকা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও মৌখিক ঐতিহ্যও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা লিখিত বা ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা না হলে প্রবীণ শিল্পীদের মৃত্যুর সঙ্গে বহু গান, সুর, পরিবেশনরীতি ও স্থানীয় ইতিহাস হারিয়ে যেতে পারে।
জনপ্রিয় বাউল শফি মণ্ডল অবশ্য প্রযুক্তির বিকাশকে লোকসংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখতে নারাজ। তিনি বলেন, প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় লোকসংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে—বিষয়টি মানতে তিনি নারাজ। তাঁর মতে, বরং লোকসংস্কৃতি আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে এবং এখন তা সারা বিশ্বে সমাদৃত।
শফি মণ্ডল বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগে লোকসংগীত নিয়ে অনেকেই ডক্টরেট করছেন। লোকসংস্কৃতির জন্য একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে হারিয়ে যেতে বসা লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ করতে হবে। তাঁর মতে, প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় কোনো কিছু হারাতেও পারে, আবার ঘুরে দাঁড়াতেও পারে। তাই প্রযুক্তিকে লোকসংস্কৃতির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার কারণ নেই।
তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল মাধ্যমের মাধ্যমে হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারে। আধুনিকতার সঙ্গে লোকসংস্কৃতির কোনো বিরোধ নেই। সময়ের সঙ্গে এর উপস্থাপন ও সংরক্ষণের পদ্ধতি পরিবর্তন করা প্রয়োজন। শিল্পীদের জীবিকা নিশ্চিত করা, নতুন প্রজন্মকে যুক্ত করা এবং প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো গেলে লোকসংস্কৃতিকে অতীতের স্মৃতি না বানিয়ে বর্তমানের জীবন্ত সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে ধরে রাখা সম্ভব।
প্রখ্যাত ঢুলি মো. রঞ্জু মিয়া বলেন, লোকসংস্কৃতি এভাবে হারিয়ে গেলে মানুষও নিজের পরিচয় হারাবে। কারণ লোকসংস্কৃতি ও মানুষ একে অপরের পরিপূরক। লোকসংস্কৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে সরকার আন্তরিক পদক্ষেপ নিলে আবহমান বাংলার চিরায়ত লোকসংস্কৃতি রক্ষা পাবে। একই সঙ্গে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষও নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারবেন।
রঞ্জু মিয়ার মতে, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ এবং সরকারের আন্তরিক উদ্যোগই লোকসংস্কৃতি রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এই সংস্কৃতি হারিয়ে গেলে মানুষও কালের গহ্বরে হারিয়ে যাবে।
সংস্কৃতিবোদ্ধাদের মতে, পুরোনো গান ও পরিবেশনা সংরক্ষণ, তরুণ শিল্পীদের প্রশিক্ষণ, অনলাইন মাধ্যমে লোকজ বিষয়বস্তু তৈরি এবং দেশ-বিদেশে তা প্রচারের মাধ্যমে লোকসংস্কৃতিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব। এসব উদ্যোগ সমন্বিত করে জাতীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা করা গেলে লোকজ ঐতিহ্যের অনেক ধারা নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন
মন্তব্য করুন