প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতি, ঝুঁকিসচেতন নগর পরিকল্পনা এবং দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সঙ্গে নদী, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতি ও বাস্তবভিত্তিক নগর পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণ বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। তাই দুর্যোগ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও সতর্ক ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।
ঢাকার ভূমিকম্পঝুঁকির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট দুর্যোগ নিয়েও সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। অপরিকল্পিত নগরব্যবস্থার কারণে ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন শহরে পরিকল্পনার অভাবে দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার উদাহরণও রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাড়িঘর নির্মাণে যথাযথ নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং নদীদূষণ বন্ধের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কাঠমান্ডু ও তেহরানের সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিকল্পিত ব্যবস্থা না থাকলে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি অনেক বেড়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের দুর্যোগঝুঁকি ও জলবায়ু পরিবর্তন
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, ভূমিধস, খরা, বজ্রপাত ও ভূমিকম্পের মতো বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে আসছে।
১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা স্মরণ করে তিনি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর প্রতিক্রিয়ার কথাও উল্লেখ করেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, ওই দুর্যোগ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতা এবং এর ফলে একটি রাষ্ট্রকে কী পরিমাণ মূল্য দিতে হতে পারে, তার বড় উদাহরণ।
বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, এ কারণে সৃষ্ট দুর্যোগ এখন বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের বিষয়। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের দায় অত্যন্ত সামান্য হলেও এর ক্ষতিকর প্রভাবের বড় ভুক্তভোগীদের মধ্যে দেশটি রয়েছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী নানা ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের অগ্রগতি
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। তাঁর মতে, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, আশ্রয়কেন্দ্র, স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ফলে দুর্যোগে প্রাণহানি অনেক কমেছে। পাশাপাশি বন্যাসহ বিভিন্ন দুর্যোগে প্রস্তুতি, উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতাও বেড়েছে।
তিনি বলেন, শুধু আগাম সতর্কবার্তা দিলেই হবে না, দুর্যোগের আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে দুর্যোগের পর দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবকদের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁদের জন্য এখনো কোনো আইন প্রণয়ন করা হয়নি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
নগর পরিকল্পনা ও পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্ব
রাষ্ট্রপতি বলেন, নদীভাঙন, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পের মতো নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এসব ঝুঁকি কমাতে পরিবেশদূষণ রোধ, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ, ঝুঁকিসচেতন নগর পরিকল্পনা এবং দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে আরও দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানির প্রবাহ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন। বর্তমান সরকারও এ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এসব কর্মসূচি আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষের প্রস্তুতির প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি সিলেটের হাওর অঞ্চলের বাসিন্দাদের উদাহরণ তুলে ধরেন। পাশাপাশি আবহাওয়া অধিদপ্তরের আগাম সতর্কবার্তা প্রদানের কার্যক্রমেরও প্রশংসা করেন তিনি।
পরিবার ও প্রতিবেশীদের প্রস্তুত রাখার আহ্বান
দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, নিজেদের ঘরবাড়ি নিরাপদ করার পাশাপাশি পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদেরও প্রস্তুতির আওতায় আনতে হবে। জরুরি কাগজপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিরাপদে রাখতে হবে এবং সরকারের আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, নদী-খাল রক্ষা এবং বৃক্ষরোপণে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বৃক্ষরোপণ অত্যন্ত জরুরি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার প্রায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এ উদ্যোগ দুর্যোগ মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দুর্যোগসহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সহনশীলতার সূচনা হোক ঘর থেকে। আসুন, ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে চলি এবং দুর্যোগ সহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলি।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুন্সী রফিকুল আলম।
সকাল ১০টার দিকে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে রাষ্ট্রপতি আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে স্থাপিত বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন। বক্তব্য দেওয়ার আগে তিনি ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির শ্রেষ্ঠ স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান। অনুষ্ঠানের শুরুতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রশমন বিষয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
মন্তব্য করুন