অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Oct 7, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

বিনিয়োগ আকর্ষণে ২০ উদ্যোগের ৭টি বাস্তবায়ন, পাইপলাইনে ১৩০ কোটি ডলার

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের নেওয়া ২০টি উদ্যোগের মধ্যে সাতটি ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশ ও খাত থেকে সম্ভাব্য ১৩০ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ পাইপলাইন তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে ৪০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে।

দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত, বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজ এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে চলতি বছরের ১৬ মার্চ ২০টি উদ্যোগ ঘোষণা করে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। এসব উদ্যোগের আওতায় অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগসেবা সহজীকরণ, নতুন প্রণোদনা এবং সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী ওই সময় বলেছিলেন, বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যের অংশ হিসেবে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অবকাঠামো, সেবার মান এবং সম্ভাবনাময় বিনিয়োগের পাইপলাইন তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ইনভেস্ট বাংলাদেশের সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) নাহিয়ান রহমান রোচি বাসসকে জানান, ২০টি উদ্যোগকে তিনটি বড় স্তম্ভের অধীনে নেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো—শক্তিশালী অবকাঠামো, বিনিয়োগে সহায়তা এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন।

অবকাঠামো উন্নয়নে বড় প্রকল্প

বাস্তবায়িত উদ্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল। এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। এপিএম টার্মিনালস ২০৩০ সালের মধ্যে টার্মিনালটির নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য নিয়েছে। এটি চালু হলে ৭০০টির বেশি প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা প্রায় ৪৪ শতাংশ বাড়বে।

চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। ২০২৮ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। শিল্পাঞ্চলটিতে এক লাখের বেশি প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হতে পারে। প্রকল্পটির বিনিয়োগ পাইপলাইনের পরিমাণ প্রায় ১৩০ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ ইতোমধ্যে সক্রিয় রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগও বাস্তবায়িত হয়েছে। বর্তমানে কাস্টমস ছাড়পত্র ও ব্যাংকিং সেবা সার্বক্ষণিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে। এতে পণ্য খালাসের সময় কমার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের বিলম্বজনিত সমস্যা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এক ছাতার নিচে বিনিয়োগসেবা

বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজ করতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষের (পিপিপিএ) বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম একীভূত করে ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

নতুন এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ সহায়তা, জমি, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের সুযোগ সম্পর্কে সমন্বিত সেবা পাওয়ার কথা।

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) সম্পন্ন হওয়াও বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে একটি বড় অগ্রগতি। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা পাবে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৪২৮টি পণ্য শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধার আওতায় থাকবে।

এর ফলে উৎপাদন, অবকাঠামো, ইলেকট্রনিকস এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী-ব্যবসায়ী সংলাপে ৭৫ শতাংশ অগ্রগতি

বিনিয়োগকারীদের সমস্যা দ্রুত সমাধানে প্রধানমন্ত্রী ও ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের মধ্যে নিয়মিত সংলাপের ব্যবস্থাও চালু হয়েছে।

প্রথম দুই দফা সংলাপে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা ২৮টি সমস্যা তুলে ধরেন। এর মধ্যে ২১টি বিষয়ে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ উত্থাপিত সমস্যার প্রায় ৭৫ শতাংশের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সপ্তম উদ্যোগ হিসেবে এফডিআই প্রণোদনা কর্মসূচিও অনুমোদন করা হয়েছে। এর আওতায় বিদেশি বিনিয়োগ দেশে আনতে সক্ষম যোগ্য ব্যক্তিকে দেশে আনা বিদেশি বিনিয়োগের ইক্যুইটির ১ দশমিক ২৫ শতাংশ সমপরিমাণ প্রণোদনা দেওয়া হবে।

এ কর্মসূচির নির্দেশিকা অনুমোদিত হয়েছে। বর্তমানে পৃথক একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ চলছে। আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে কর্মসূচিটি চালুর লক্ষ্য রয়েছে।

বাকি ১৩ উদ্যোগও এগোচ্ছে

ইনভেস্ট বাংলাদেশের ২০ উদ্যোগের বাকি ১৩টিও বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল, মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, প্রথম সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ), বাংলাবিজ বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্মের সম্প্রসারণ, চীনের গুয়াংজুতে ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয় স্থাপন এবং দেশব্যাপী শিল্প খাতের ম্যাপিং।

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কাঠামোর আওতায় পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মধ্যে একটি কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইউএইভিত্তিক বন্দর ও লজিস্টিকস অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড এই কনসেশন ব্যবস্থায় যুক্ত থাকবে। এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালন সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের বন্দর ও লজিস্টিকস অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ চালু করার লক্ষ্য রয়েছে। এটি চালু হলে বিমানবন্দরের বার্ষিক কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ২ লাখ টন থেকে বেড়ে ৫ লাখ টনে দাঁড়াবে। অর্থাৎ সক্ষমতা বাড়বে ১৫০ শতাংশ। এ টার্মিনাল থেকে ৬ হাজারের বেশি প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানও হবে।

১৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ পাইপলাইন

নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হচ্ছে। ইনভেস্ট বাংলাদেশ ১৩০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগ পাইপলাইন তৈরি করেছে। এর মধ্যে ৪০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে।

দেশভিত্তিক সম্ভাব্য বিনিয়োগের মধ্যে চীন থেকে ৬০ কোটি ডলার, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৩০ কোটি ডলার, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০ কোটি ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১০ কোটি ডলার আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

খাতভিত্তিক হিসাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রায় ৩০ কোটি ডলার করে বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা ও বস্ত্র খাতে রয়েছে ২০ কোটি ডলার করে বিনিয়োগের সম্ভাবনা।

নতুন বিনিয়োগের সুযোগ চিহ্নিত করতে ইনভেস্ট বাংলাদেশ এফডিআই হিটম্যাপও তৈরি করেছে। এতে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে উন্নতমানের বস্ত্র, ওষুধশিল্প, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অন্যদিকে অটোমোটিভ যন্ত্রাংশ, হালকা প্রকৌশল, জুতা এবং চামড়াজাত পণ্যকে দ্রুত বিনিয়োগ প্রবেশের উপযোগী খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

দ্রুত সেবা পেতে নতুন প্যাকেজ

বিনিয়োগকারীদের দ্রুত সেবা দিতে বাংলাবিজের আওতায় তিন দিনের ‘বিজনেস স্টার্টার প্যাকেজ’ চালুর কাজ চলছে। পাশাপাশি ১৪ দিনের ‘বিজনেস রেডিনেস প্যাকেজ’ তৈরি করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বিনিয়োগের শুরু থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ করার লক্ষ্য রয়েছে।

নাহিয়ান রহমান রোচি জানান, পাঁচটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের অধীনে ১০ হাজার একরের বেশি শিল্প জমিতে ৪৪টি বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে একটি পোর্টফোলিও তৈরির কাজও চলছে। একই সঙ্গে চীনে বিনিয়োগ প্রচার ও যোগাযোগ বাড়াতে গুয়াংজুতে ইনভেস্ট বাংলাদেশের একটি কার্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের কয়েকটি বড় সমস্যা হলো অবকাঠামোর ঘাটতি, বিচ্ছিন্ন সেবা, অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা এবং বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত প্রকল্পের সীমিত সুযোগ। এসব সমস্যা মোকাবিলায় নেওয়া উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য আরও পূর্বানুমানযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার পথ আরও সুগম হবে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন মাত্রা: হ

1

সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে সরকার: স

2

কৃষকদের স্বার্থে জাতীয় পর্যায়ে কেন্দ্রীয় সংগঠন গড়ার আহ্বান র

3

ভূতের গুজবে পাঞ্জাবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, গ্

4

শিরোপা জয়ে ভারতের সামনে বাংলাদেশ

5

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের নতুন সচিব ড. মো. কামরুজ্জামান

6

নবীন বরণ ও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে রঙিন ক্যাম্পাস

7

জুলাই-আগস্টে বিদেশি ঋণ পরিশোধ ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা

8

ডেঙ্গু মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র দিল ৫ লাখ টেস্ট কিট

9

শিশুকে শরীর ও সম্মতি নিয়ে স্বচ্ছন্দে কথা শেখানোর পরামর্শ দিয়

10

লাইট ক্যামেরা অ্যাকশনেই দিন কাটে নাজনীন নীহার

11

জাতীয় প্রতিযোগিতায় সেরা তরুণদের জাতিসংঘে পাঠাবে সরকার: মাহ্দ

12

ভুয়া তথ্য প্রচারে ক্ষুব্ধ মিমি, আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি

13

তেলের আকাশচুম্বী দামে থমকে গেল আজীবন সমুদ্রে থাকার স্বপ্ন

14

জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ স্থানীয় সরক

15

ধর্ম যার যার, পরিচয় সবার বাংলাদেশি: প্রধানমন্ত্রী

16

সুস্থ ও দায়িত্বশীল প্রজন্ম গড়তে খেলাধুলার বিকল্প নেই: চিফ হু

17

ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনে

18

মানব পাচার দমনে উইনরকের সহযোগিতা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে প

19

ইরান দলের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ইঙ্গিত যুক্তরাষ্ট্রের

20