জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাঁচ দিনের নিউইয়র্ক সফরে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপাক্ষিক বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেছেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাঁচ দিনের নিউইয়র্ক সফরে বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ও বহুপাক্ষিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও অগ্রাধিকারগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার পর আজ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহ্দী আমিন জানান, নিউইয়র্কে চার কর্মদিবসে প্রধানমন্ত্রী মোট ৩০টি কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর মধ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ-সংশ্লিষ্ট আটটি কর্মসূচি এবং ১১টি প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসূচি ছিল। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা সম্মিলিতভাবে প্রায় ৮০টি কর্মসূচিতে অংশ নেন।
এসব কর্মসূচিতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক শান্তিসহ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসে।
মাহ্দী আমিন বলেন, চার কর্মদিবসের এই সফরে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে বাংলাদেশের স্বার্থ ও সম্ভাবনাগুলো তুলে ধরেছেন এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা সমুন্নত রেখেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘে এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া প্রথম ভাষণকে সফরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন মাহ্দী আমিন। ভাষণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং তরুণ ও নারীদের জন্য সরকারের বিভিন্ন নীতি, কর্মসূচি ও পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়।
তিনি বলেন, এসব নীতি ও পরিকল্পনা ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মাহ্দী আমিন জানান, সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বশান্তি, ফিলিস্তিন ও রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। পাশাপাশি একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও জনকল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার বিষয়ে সরকারের রূপকল্পও উপস্থাপন করেন।
সাধারণ বিতর্কে অংশগ্রহণের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু মোকাবিলা, ন্যায়সঙ্গত উত্তরণ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য ও ধাত্রীসেবা বিষয়ক বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বা অংশ নেন।
সফরকালে বিশ্বশান্তি ও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শুধু বাংলাদেশের বিষয় নিয়ে কথা বলেননি, বিশ্বশান্তির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। ফিলিস্তিনে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বাংলাদেশের প্রত্যাশার কথাও তিনি তুলে ধরেছেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সময় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাকেও ফিলিস্তিন ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থানের প্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেন মাহ্দী আমিন।
তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে সমর্থনের আশ্বাস পেয়েছে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকারও বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান প্রশংসা করেছে বলে জানান তিনি।
মাহ্দী আমিন আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অনেক বছর পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। সফরকালে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণভাবে স্বাগত জানিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সফরে উপস্থাপিত নীতি, কর্মসূচি ও পরিকল্পনাগুলো এখন বাস্তবায়নের পথে নিয়ে যেতে সরকার কাজ করবে বলে জানান মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করে বাংলাদেশকে স্বনির্ভর ও আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে হবে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু আব্দুল্লাহ এম ছালেহ (সালেহ শিবলী) বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরে অনেক সফলতা রয়েছে। তাঁর মতে, এই সফরের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটেছে।
শিবলী বলেন, অতীতে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানাতে বিমানবন্দরে বিপুলসংখ্যক দলীয় নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের ভিড় করার যে রেওয়াজ ছিল, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের জমায়েতকে সমর্থন বা উৎসাহিত করেননি।
তিনি বলেন, প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটি একটি গুণগত পরিবর্তন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী দলের আকারের বিষয়টিও তুলে ধরেন প্রেস সচিব। তিনি জানান, সফরসঙ্গী দলে সদস্য ছিলেন মাত্র ৩৫ জন।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে বড় বহর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরিবর্তে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের বাণিজ্যিক ফ্লাইটে নিউইয়র্ক যান। দেশে ফেরার সময় তিনি এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ব্যবহার করেন বলেও জানান শিবলী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিউইয়র্কে চার কর্মদিবসসহ মোট পাঁচ দিনের সফর শেষে আজ সকালে দেশে ফিরেছেন।