অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Jun 8, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

বিশ্বকাপের বাঁশি বাজাতে রেফারিদের কঠিন অগ্নিপরীক্ষা

ফুটবল বিশ্বকাপের আলো ঝলমলে মঞ্চে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স যেমন সবার নজর কাড়ে, তেমনি মাঠের আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র রেফারিদের ওপরও থাকে অসীম দায়িত্বের চাপ। একটি ভুল সিদ্ধান্ত যেমন কোনো দলের স্বপ্ন ভেঙে দিতে পারে, তেমনি তা মুহূর্তেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে একজন রেফারির বহু বছরের পরিশ্রম, সুনাম এবং ক্যারিয়ার। তাই বিশ্বকাপে দায়িত্ব পাওয়ার পথটি শুধু সম্মানের নয়, বরং কঠিন পরীক্ষা, মানসিক দৃঢ়তা এবং অসাধারণ পেশাদারিত্বেরও প্রতীক।

সম্প্রতি ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য রেফারি প্যানেল চূড়ান্ত করার পর আবারও আলোচনায় এসেছে এই পেশার অজানা বাস্তবতা। চূড়ান্ত তালিকায় জায়গা পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ইসমাইল এলফাত যখন স্বপ্নপূরণের আনন্দে উচ্ছ্বসিত, তখন বাদ পড়ার হতাশা নিয়ে ফিরতে হয়েছে ইতালির অভিজ্ঞ রেফারি মার্কো গুইদা-সহ আরও অনেককে।

বিশ্বকাপে দায়িত্ব পাওয়া একজন রেফারির জন্য ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এই গন্তব্যে পৌঁছাতে তাদের পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ ও কঠিন পথ। বছরের পর বছর ধরে ফিফার নিবিড় পর্যবেক্ষণ, ধারাবাহিক মূল্যায়ন, ফিটনেস টেস্ট এবং ম্যাচ পারফরম্যান্স বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। শুধু ম্যাচ পরিচালনার দক্ষতাই নয়, তাদের শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং চাপ সামাল দেওয়ার ক্ষমতাও নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করা হয়।

রেফারিদের গতি, অবস্থান পরিবর্তন, সহনশীলতা এবং ম্যাচ পরিচালনার সময়কার শারীরিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে আধুনিক জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এমনকি তাদের বিশ্রাম ও ঘুমের তথ্যও বিশ্লেষণ করা হয়, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় তারা সর্বোচ্চ মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতিতে রয়েছেন। বিভিন্ন মহাদেশীয় কনফেডারেশনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে স্পোর্টস সায়েন্টিস্টদের সহায়তায় চাপের মুহূর্তে রেফারিদের শারীরিক প্রতিক্রিয়াও মূল্যায়ন করা হয়।

তবে মাঠে নামার পর বাস্তবতা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। একজন রেফারিকে শুধু ২২ জন খেলোয়াড়ের খেলা নিয়ন্ত্রণ করলেই হয় না, অনেক সময় তাকে সামলাতে হয় ইতিহাস, রাজনীতি এবং জাতীয় আবেগের সংঘর্ষও। বিশ্বকাপের কিছু ম্যাচে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট উত্তেজনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এমন পরিস্থিতিতে একটি সিদ্ধান্তের প্রভাব মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শকের নজর যখন একটি বাঁশির শব্দের দিকে নিবদ্ধ থাকে, তখন রেফারিদের ওপর মানসিক চাপ কতটা তীব্র হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। একটি পেনাল্টি, অফসাইড বা লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বব্যাপী বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে সেই চাপ আরও বেড়েছে। ম্যাচের পরপরই রেফারিদের প্রশংসা যেমন আসে, তেমনি সমালোচনা, ট্রোলিং এবং ব্যক্তিগত আক্রমণেরও শিকার হতে হয় তাদের।

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব শেষ হওয়ার পর শুরু হয় আরেক ধরনের প্রতিযোগিতা। প্রতিটি ম্যাচে পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে রেফারিদের মূল্যায়ন করা হয় এবং পরবর্তী রাউন্ডে দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগ নির্ধারিত হয়। ফলে মাঠে খেলোয়াড়দের পাশাপাশি রেফারিদের মধ্যেও চলে এক নীরব প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অনেক সময় বিতর্ক এড়ানোর কৌশল হিসেবে ভালো পারফরম্যান্সের পরও কিছু রেফারিকে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয়, যা তাদের জন্য বড় ধরনের হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রতিটি রেফারিরই স্বপ্ন থাকে বিশ্বকাপ ফাইনাল পরিচালনার। কিন্তু সেখানে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন। দক্ষতা ও পারফরম্যান্সের পাশাপাশি অনেক সময় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও ভৌগোলিক সমীকরণও ভূমিকা রাখে। ফলে সেরা পারফরম্যান্স দেখিয়েও অনেক রেফারি ফাইনালের দায়িত্ব পান না।

তারপরও যারা সব বাধা অতিক্রম করে বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজানোর সুযোগ পান, তাদের জন্য সেটি জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় মুহূর্ত হয়ে থাকে। সেই অর্জন শুধু একটি ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে নিরলস পরিশ্রম, আত্মত্যাগ এবং অসংখ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার স্বীকৃতি।

বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরও তাদের যাত্রা থেমে থাকে না। একটি আসরের স্মৃতি পেছনে ফেলে আবার শুরু হয় পরবর্তী বিশ্বকাপের প্রস্তুতি। নতুন লক্ষ্য, নতুন মূল্যায়ন এবং নতুন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে রেফারিদের সেই অন্তহীন সংগ্রাম চলতেই থাকে।

সূত্র: গার্ডিয়ান

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইউডিসিজিপি বড় ধরনের প্রকল্পগুলো জমি অধিগ্রহনের কারনে কাজের অ

1

চীন-রাশিয়া সম্পর্ক এখন ‘আরও মূল্যবান’: শি জিনপিং

2

সব মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতিবিরোধী কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত

3

জাতির সঙ্গে ইনসাফ হয়নি-অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনায় জামায়াত

4

গুম-খুন ও জুলাই শহীদ-আহত পরিবারের ৭৪ জনকে চাকরির নিয়োগপত্র দ

5

ই-রিকশা ব্যবস্থাপনায় নীতিমালা করছে সরকার

6

গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের রূপকার কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের ১৮তম

7

কর্মক্ষম জনসংখ্যা বাড়ছে, তবু শ্রমবাজারের বাইরে বড় জনগোষ্ঠী

8

বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার প্রত্যাশা এলজি

9

১৫ বছর পর অশ্বিন-জাদেজাহীন ভারত

10

বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ যথাযোগ্য মর্যাদায় উদ্‌যাপনে বিরলে বিভিন্ন

11

বেনজীরকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া চলছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

12

সিলেটের পর্যটন ও চা শিল্পে বিনিয়োগের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

13

গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে, ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে: মাহ্দী আমিন

14

সবুজ ঢাকা গড়তে বৃক্ষরোপণে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান

15

চীনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরখাস্ত

16

পরমাণু বর্জ্য সংরক্ষণে সিঙ্গাপুরের সম্ভাবনা, বলছে গবেষণা

17

দেশে সারের সংকট নেই, সুষ্ঠু বিতরণে মনিটরিং জোরদারের নির্দেশ

18

ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগে তদবির-স্বজনপ্রীতির সুযোগ নেই

19

খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে জীবনযাত

20