অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Oct 2, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

চট্টগ্রামে পাঁচ বছরে বেড়েছে আখের আবাদ ও উৎপাদন

চট্টগ্রামে গত পাঁচ বছরে আখের আবাদ ও উৎপাদন—দুটিই বেড়েছে। নদী ও খালের তীরবর্তী পলিমাটির জমিতে আখের ভালো ফলন হওয়ায় কৃষকদের আগ্রহও বাড়ছে। এ বছর জেলায় ৪৪০ হেক্টর জমিতে প্রায় ২৫ হাজার ৯২ মেট্রিক টন আখ উৎপাদন হয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন সড়ক ও বাজারে এখন দেখা মিলছে সারি সারি আখের। কোথাও রাস্তার পাশে বাঁশের খুঁটিতে ঠেস দিয়ে আখ সাজিয়ে রাখা হয়েছে, কোথাও ভ্যানভর্তি আখ নিয়ে বিক্রি করছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। পথচারীদের অনেকে থেমে আখ কিনছেন, আবার কেউ আখের রসের স্বাদ নিচ্ছেন।

নগরীর কোতোয়ালীর ফিরিঙ্গীবাজার এলাকার সবজি ও ফলের আড়তে এ সময় নতুন পণ্য হিসেবে প্রতিদিন ট্রাকে করে আসছে আখ। বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা আখ এনে আড়তে নামাচ্ছেন। পরে সেখান থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আখ কিনে নগরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করছেন।

চট্টগ্রাম নগরীতে সরবরাহ হওয়া এসব আখের বড় একটি অংশ আসে জেলার নদী ও খালঘেঁষা বিভিন্ন এলাকা থেকে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, বোয়ালখালী, বাঁশখালী এবং উত্তর চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া ও দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের নদীতীরবর্তী এলাকায় গত পাঁচ বছর ধরে আখের আবাদ ও উৎপাদন বাড়ছে।

বছরভেদে আবাদ ও উৎপাদনে কিছুটা ওঠানামা থাকলেও আখ চাষে কৃষকদের আগ্রহ ও লাভের পরিমাণ বাড়ছে। এর প্রভাব পড়েছে শহর ও গ্রামের বাজারেও। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ বছর প্রায় দুই মাস ধরে বাজারে আখ পাওয়া যাচ্ছে এবং আরও কয়েক মাস তা পাওয়া যেতে পারে।

কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক কানি বা ৪০ শতক জমিতে প্রায় ৮ হাজার পিস আখ উৎপাদন হয়। গড়ে এসব আখ বিক্রি হয় প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায়। সে হিসাবে হেক্টরপ্রতি আখের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা। চট্টগ্রামে চলতি বছর ৪৪০ হেক্টর জমিতে প্রায় ৩০ কোটি টাকার আখ উৎপাদন হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বাসসকে বলেন, চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলার প্রায় সব জায়গাতেই কমবেশি আখের চাষ হয়। তবে চরভূমি ও নদীর তীরবর্তী পলিমাটিসমৃদ্ধ জমিতে আখের ফলন ভালো হয়।

তিনি বলেন, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর ওপর দিয়ে প্রবাহিত শঙ্খ ও ডলু নদীর তীরঘেঁষা জমিতে প্রতি বছরই ভালো আখ উৎপাদন হচ্ছে। রাঙ্গুনিয়ার কর্ণফুলী ও ইছামতী নদীর তীরেও আখের আবাদ বাড়ছে। কর্ণফুলীর তীরবর্তী বোয়ালখালীতেও ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়ছে। বর্তমানে বাজারে আসা আখের বড় একটি অংশ চন্দনাইশের দোহাজারী ও সাতকানিয়া এলাকা থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জানান, শীতের শেষভাগে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে কৃষকেরা জমিতে আখের চারা রোপণ করেন। ছয় থেকে সাত মাস পরিচর্যার পর জুলাই থেকে আখ কাটা শুরু হয়। পরে স্থানীয় বাজার হয়ে এসব আখ চট্টগ্রাম নগরে আসে। ফলে বর্ষা থেকে শরৎকাল পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন সড়ক ও বাজারে আখের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। মাঠে আখের আবাদ বাড়ার পাশাপাশি নগরবাসীর মধ্যেও এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে জেলায় আখের আবাদ ও উৎপাদন দুটিই বেড়েছে। ২০২১ সালে জেলার ৩৬৬ হেক্টর জমিতে আখ উৎপাদন হয়েছিল ১৯ হাজার ৬৭ মেট্রিক টন। হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ছিল ৫২ টন। পাঁচ বছর পর ২০২৬ সালে আবাদ বেড়ে হয়েছে ৪৪০ হেক্টর এবং উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৯২ মেট্রিক টনে। হেক্টরপ্রতি উৎপাদনও বেড়ে হয়েছে ৫৮ টন।

অর্থাৎ ২০২১ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে আখের আবাদ বেড়েছে ৭৪ হেক্টর এবং উৎপাদন বেড়েছে ৬ হাজার ২৫ মেট্রিক টন। একই সময়ে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বেড়েছে ৬ টন। মাঝের বছরগুলোতেও আবাদ ও উৎপাদনে মোটের ওপর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।

২০২২ সালে ৩৮৯ হেক্টর জমিতে আখ উৎপাদন হয় ২১ হাজার ৩৯৫ টন। হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ছিল ৫৫ টন। ২০২৩ সালে আবাদ কিছুটা কমে ৩৭১ হেক্টরে নেমে এলেও উৎপাদন হয় ২০ হাজার ৪০৫ মেট্রিক টন। ওই বছর হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ছিল ৫৫ টন।

এরপর ২০২৪ সালে আবাদ বেড়ে ৪০৪ হেক্টর এবং উৎপাদন ২২ হাজার ৪০৫ মেট্রিক টনে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালে আবাদ আরও বেড়ে ৪৪০ হেক্টরে পৌঁছে এবং উৎপাদন হয় ২৪ হাজার ৪০৫ মেট্রিক টন। চলতি বছর একই পরিমাণ জমিতে উৎপাদন বেড়ে হয়েছে ২৫ হাজার ৯২ মেট্রিক টন।

জেলায় আখের আবাদে সবচেয়ে বেশি অবদান চন্দনাইশের। বছরের পর বছর এ উপজেলায় জেলার সর্বোচ্চ পরিমাণ জমিতে আখ চাষ হচ্ছে। ২০২১ সালে চন্দনাইশে ১৩০ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়েছিল এবং হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ছিল ৫৮ টন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সেখানে ১২০ হেক্টর করে জমিতে আবাদ হয়। চলতি বছর তা বেড়ে হয়েছে ১৫০ হেক্টর।

চন্দনাইশের পর কয়েক বছর আবাদে রাঙ্গুনিয়ার অবস্থান ছিল দ্বিতীয় এবং সাতকানিয়া ছিল তৃতীয়। ২০২১ সালে রাঙ্গুনিয়ায় ৫৫ হেক্টর এবং সাতকানিয়ায় ৫০ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়েছিল। তবে চলতি বছর এ অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে বাঁশখালী। সেখানে এবার ৬০ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়েছে।

চন্দনাইশের দোহাজারী জামিজুরি এলাকার কৃষক মো. কাশেম বাসসকে বলেন, এবার তিনি ৫ কানি বা দুই একর জমিতে আখ চাষ করেছেন। প্রতি কানি জমিতে চাষের খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। বর্তমানে মাঠেই প্রতি কানি আখ ১ লাখ ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এতে খরচ বাদ দিয়ে প্রতি কানি জমিতে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ থাকছে।

তবে মাঠে আখ বিক্রির হিসাবের সঙ্গে শহরের আড়তের হিসাবের পার্থক্য রয়েছে। সরকারি উৎপাদনের হিসাব মেট্রিক টনে হলেও চট্টগ্রাম শহরের আড়তে আখ বিক্রি হয় শ’ হিসেবে। আকারভেদে ১০০ আখের দাম প্রায় ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা।

ফিরিঙ্গীবাজারের আড়তে প্রতিদিন শত শত ট্রাক আখ আসছে। এসবের বড় অংশই চন্দনাইশের দোহাজারী ও সাতকানিয়া থেকে আসে। পাশাপাশি বাঁশখালী ও রাঙ্গুনিয়া থেকেও আখ সরবরাহ করা হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলার উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আপ্রু মারমা বাসসকে বলেন, নদীতীরবর্তী পলিমাটির জমি, পর্যাপ্ত রোদ ও জমির উর্বরতা আখের ফলনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। চট্টগ্রামে গত কয়েক বছরে আখের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির পরিসংখ্যানেও সেই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, আখ চাষ করে কৃষকেরা এখন ভালো মুনাফা করতে পারছেন। এ কারণে অনেকে আখ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। সরকারি পক্ষ থেকে আখ চাষিদের বিভিন্ন ধরনের তথ্য সহায়তাও দেওয়া হয়।

আখের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা সম্পর্কে চট্টগ্রামের ক্লিনিক্যাল পুষ্টিবিদ এবং ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনসালট্যান্ট (ডায়েট ও নিউট্রিশন) হাসিনা আকতার লিপি বাসসকে বলেন, আখের রস একটি উপকারী পানীয়। ১০০ গ্রাম আখের রসে ৪৯ কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। এতে ভিটামিন, খনিজ লবণ ও প্রাকৃতিক চিনি থাকায় এটি শক্তিদায়ক। শরীরের দুর্বলতা দূর করতেও এটি ভালো কাজ করে। লিভারের সুস্থতা, বিশেষ করে জন্ডিসের ক্ষেত্রে এটি উপকারী বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, গরমের দিনে আখের রস পানিশূন্যতা দূর করতে সহায়তা করে। তবে এতে প্রাকৃতিক চিনি বেশি থাকায় এটি ক্যালরিবহুল এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এটি নিষেধ।

হাসিনা আকতার লিপি আরও বলেন, রাস্তার পাশে আখের রস তৈরির যন্ত্রে তৈরি রস পান করা উচিত নয়। ওই প্রক্রিয়ায় জীবাণু থাকার আশঙ্কা থাকে, যা থেকে পানিবাহিত রোগ ছড়াতে পারে। চটপটির তেঁতুলের পানি থেকে যেভাবে রোগ ছড়াতে পারে, একইভাবে এখান থেকেও রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। তাই তিনি আস্ত আখ চিবিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেন। এতে দাঁতেরও উপকার পাওয়া যায়।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

গুমের শিকারদের ন্যায়বিচার ও পুনর্বাসন নিশ্চিতের দাবি রিজভীর

1

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিত

2

টেকসই এলডিসি উত্তরণে আরও সময় চায় বাংলাদেশ

3

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে নতুন চেয়ারম্যান ও এমডি

4

জাতিসংঘের ৮১তম সভাপতির কার্যালয়ে লিগ্যাল অফিসার জাইমা রহমান

5

৪৬ জেলায় ১২০ প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১০ লাখ টাকা জরিমানা

6

সব ধর্মের মানুষের শান্তি-সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে হবে: প্রধানম

7

বাংলাদেশে সমন্বিত ক্যান্সার চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ার অঙ্গীকার বি

8

চাঁদের আলোয় গোসল করছে পৃথিবী!

9

বন্ধ পাটকল চালু করছে সরকার, সৃষ্টি হবে ৫০ হাজার কর্মসংস্থান

10

প্রতিরোধভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা গড়ছে বাংলাদেশ: ডা. জু

11

২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে প্রযুক্তি রপ্

12

বেনজীরকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া চলছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

13

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে থাকছে না দলীয় প্রতীক, যোগ্য সবাই প

14

মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক

15

সার্ক পুনরুজ্জীবন ও বাণিজ্য বাড়াতে নেপালের সহযোগিতা চান মন্ত

16

পুলিশের জন্য ৬ হাজার ৬০৮ কোটি টাকায় ৫,৮৩০টি যানবাহন কেনার প্

17

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক জোরদারে আশাবাদ

18

নির্বাচন কমিশনবিরোধী বিক্ষোভ ছড়াচ্ছে ভারতে

19

তারেক রহমানের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অঙ্গীকারের প্রশংসা তাকা

20