দেশের রোগীদের বিদেশমুখী চিকিৎসা নির্ভরতা কমাতে বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও রোগীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সেবার মান উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
রাজধানীর শহীদ আবু সাইদ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে দুই দিনব্যাপী ‘কোলোরেক্টাল সার্জারি সম্মেলন-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আজ সকালে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশের অনেক রোগী বিদেশে যেতে বাধ্য হন। বিশেষায়িত চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, দক্ষ জনবলের ঘাটতি এবং চিকিৎসাসেবার মান ও আস্থার বিষয় এর পেছনে ভূমিকা রাখে। এর ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যায়। এই প্রবণতা কমাতে দেশেই আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, দক্ষ জনবল নিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি আধুনিক, সাশ্রয়ী ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
চিকিৎসাসেবায় মানবিকতার গুরুত্ব তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, চিকিৎসা শুধু একটি পেশা নয়; এটি মানুষের জীবন, মর্যাদা ও আশার সঙ্গে সম্পর্কিত মহান দায়িত্ব। রোগীর সঙ্গে মানবিক আচরণ, চিকিৎসার বিষয়গুলো সহজ ভাষায় রোগী ও তাঁর স্বজনদের বুঝিয়ে বলা এবং পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখা অপরিহার্য। একই সঙ্গে দরিদ্র রোগীদের প্রতি বিশেষ সহমর্মিতা দেখাতে হবে।
আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে কেউ যেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন, সে জন্য সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বিগত ১৭ বছরে ফ্যাসিবাদী শাসন, অব্যবস্থাপনা, সীমাহীন দুর্নীতি ও অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে সময়মতো চিকিৎসা, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল নিশ্চিত না করেই ব্যয়বহুল চিকিৎসা ও পরীক্ষার যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। অবকাঠামোর অভাবে অনেক যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত পড়ে থেকেছে। এমনকি টেকনিশিয়ান ও প্রয়োজনীয় কর্মী ছাড়াই পরীক্ষাগারের যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ান নিয়োগে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
অতীতের এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল, জনবান্ধব নীতি, জবাবদিহিতা এবং সরকারি অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন রাষ্ট্রপতি।
এ সময় দেশের চিকিৎসা খাতের উন্নয়নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিভিন্ন উদ্যোগের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।
বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য খাতের উদ্যোগ তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। বরাদ্দের প্রতিটি টাকা কার্যকর, যথাযথ ও স্বচ্ছভাবে ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি জানান, সরকার দেশের ১০০ শয্যার হাসপাতালগুলোকে পর্যায়ক্রমে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় ও উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, টেকনিশিয়ান ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের মাধ্যমে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও জনমুখী করার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।
কোলোরেক্টাল রোগের প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ এসব রোগে আক্রান্ত। কিন্তু লজ্জা, সংকোচ ও অসচেতনতার কারণে অনেকেই চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন। এতে রোগ জটিল আকার ধারণ করে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং সহজলভ্য বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সম্মেলনে একটি জাতীয় কোলোরেক্টাল সার্জারি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হলে রাষ্ট্রপতি এ বিষয়ে যথাযথ সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
সম্মেলনের সফলতা কামনা করে তিনি বলেন, এখানে দেশ-বিদেশের বিশ্বসেরা সার্জনদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থেকে অংশগ্রহণকারীরা সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ পাবেন। অর্জিত জ্ঞান দেশের সাধারণ মানুষের সেবায় কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, চিকিৎসকদের হাত ধরেই বাংলাদেশ একটি আধুনিক, সাশ্রয়ী, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাবে।
অনুষ্ঠানের আগে বাংলাদেশ সোসাইটি অব কোলন অ্যান্ড রেক্টাল সার্জন্সের (বিএসসিআরএস) পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয়।
বিএসসিআরএসের সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনটির উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. সাহাদত হোসেন শেখ।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এফ এম সিদ্দিকী, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদ, বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স ও সার্জন্সের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে এম আজিজুল হক এবং ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল।
দুই দিনব্যাপী এ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের তরুণ চিকিৎসকদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেবেন এবং তাঁদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় করবেন।
মন্তব্য করুন